যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবির পর রাজনৈতিক কৌশলে স্পষ্ট পরিবর্তন এনেছেন ৪২ বছর বয়সী ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত নীতিগুলোর পক্ষে সাফাই গাওয়ার পরিবর্তে ভ্যান্স এখন নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসছেন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ট্রাম্প-পরবর্তী যুগে রিপাবলিকান পার্টির নেতৃত্বে নিজের অবস্থান শক্ত করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নিচ্ছেন তিনি।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত রিপাবলিকান সম্মেলনের পর থেকে জেডি ভ্যান্সের দেওয়া ছয়টি ভাষণ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তিনি মূলত নিজের নীতিগত অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন। এতে তিনি অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, সংযত পররাষ্ট্রনীতি এবং জননিরাপত্তার ওপর জোর দিয়েছেন। বিপরীতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ও গণ-অভিবাসীদের বহিষ্কারের মতো ট্রাম্পের প্রধান নীতিগুলো এড়িয়ে গেছেন ভ্যান্স। জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ায় রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রচারণায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছিল, যা কাটাতে এই কৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত দুজন ব্যক্তি নিশ্চিত করেছেন। তাদের মতে, ভ্যান্স ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা হলেও এসব নীতিকে এখন আরও কার্যকর উপায়ে উপস্থাপন করছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের পর গত বুধবারে দেওয়া এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে ভ্যান্স নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেন। সেখানে তিনি রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পেছনে ইরান যুদ্ধকে দায়ী করে দ্রুত সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানান। পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, পররাষ্ট্রনীতি পুনর্মূল্যায়ন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ট্রাম্প যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগকে ডেমোক্র্যাটদের ‘প্রতারণা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, সেখানে ভ্যান্স বিষয়টিকে দলীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। এ ছাড়া ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের তদবিরের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধে জড়ায় এবং ট্রাম্প এতে প্রকাশ্য সমর্থন দেন। তবে ভ্যান্সের এমন অবস্থানের পরও হোয়াইট হাউস ও ভ্যান্সের যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত তিন কর্মকর্তা জানান, এটি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ইঙ্গিত নয়। এমনকি ওই পোস্টের বিষয়ে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস আগেই অবগত ছিলেন।
এরই মধ্যে গত শুক্রবারে হোয়াইট হাউসের শীর্ষ প্রশাসনে বড় রদবদল আনেন ট্রাম্প। সুসি ওয়াইলসকে সরিয়ে স্টিফেন মিলারকে নতুন চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ট্রাম্পের কঠোর নীতিগুলো জোরদার করার সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি রিপাবলিকানদের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে, তবে তিনি যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। বুধবারে সাংবাদিকদের তিনি স্পষ্ট জানান, তিনি ভিন্ন কিছু করতেন না।
রাজনৈতিক অঙ্গনে ভ্যান্সের এই পরিবর্তন নিয়ে নানা সমীকরণ শুরু হয়েছে। সাবেক হাউস স্পিকার জন বোহনার ও পল রায়ানের উপদেষ্টা রিপাবলিকান কৌশলবিদ মাইকেল রিচির মতে, ভ্যান্সের এই পদক্ষেপ তাকে ট্রাম্প-পরবর্তী রক্ষণশীল রাজনীতির সম্ভাব্য শীর্ষ মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। এর ফলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীরা কোন নীতিকে অগ্রাধিকার দেবেন এবং ইরান যুদ্ধের যৌক্তিকতা কতটুকু, তা নিয়ে দলে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদ ইগর ভলস্কি মনে করেন, ২০২৮ সালের নির্বাচনে ভ্যান্সের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে ট্রাম্পের সমর্থন বজায় রেখেও সাধারণ ভোটারদের টানতে তার বিতর্কিত নীতিগুলো থেকে দূরত্ব বজায় রাখা। ভ্যান্স এখনো ২০২৮ সালের নির্বাচনে লড়ার বিষয়ে কিছু জানাননি, আবার ট্রাম্পও কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দেননি।
তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ভ্যান্সের রাজনৈতিক প্রভাবও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তিনি যেসব অঙ্গরাজ্যে প্রচারণা চালিয়েছিলেন, সেখানে রিপাবলিকান প্রার্থীরা হেরে গেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ওহাইওর গভর্নর পদে রিপাবলিকান প্রার্থী বিবেক রামাস্বামীর একটি বিজ্ঞাপনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাক্টনের যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার বিষয়ে সন্দেহ তোলা হয়েছিল; ভ্যান্স সমর্থিত এই জাতীয় বিতর্কিত প্রচারণা দলটির ক্ষতি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচনে পরাজয় নিয়ে দলের ভেতরের মতামতও বিভক্ত। টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ মনে করেন, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে দল যথেষ্ট নজর দেয়নি। আর ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের মতে, পরাজিত প্রার্থীরা ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে অতিরিক্ত ফোকাস করেছিলেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সেন্টার নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ উপেক্ষা করেছেন।
নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ভ্যান্স স্বাস্থ্যসেবা ও দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচির জালিয়াতি তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেন এবং অভিবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে কথা বলেন। তবে পুরো সময়ে তিনি ইরান যুদ্ধ বা জ্বালানির দাম নিয়ে তেমন মন্তব্য করেননি এবং ট্রাম্পের নামও খুব কম উল্লেখ করেছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, ভ্যান্স ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখার পাশাপাশি নিজের একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করছেন, যদিও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে এই কৌশল কতটা সফল হবে তা সময়েই বোঝা যাবে।





