ঝগড়ায় মা-বোনকে নিয়ে কটু কথা: কেন এমনটা করে সমাজ?

Published: November 7, 2026, 8:57 am

দুই ব্যক্তির মধ্যে বিরোধ বা মতবিরোধের সময় অহরহ দেখা যায়, গালির লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন প্রতিপক্ষের পরিবারের নারী সদস্য—মা কিংবা বোন। ব্যক্তিগত ঝগড়া থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তপ্ত বিতর্ক পর্যন্ত, মা-বোনকে নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ গালি দেওয়ার এই প্রবণতা কেবল পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, নারীদের মুখেও শোনা যায়। সম্প্রতি চলচ্চিত্র অভিনেত্রী পরীমণির আদালতে আত্মসমর্পণ করতে গিয়ে এক সাংবাদিকের মায়ের উদ্দেশ্যে করা অশ্লীল গালিগালাজ ও হুমকির ঘটনাটি এই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।

প্রশ্ন ওঠে, বিরোধ যখন দুজন মানুষের মধ্যে, তখন পরিবারের নারীরা কেন অপমানের শিকার হন? ভাষা ও সমাজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই গালিগুলো কেবল অশালীন শব্দ নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্ষমতা, যৌনতা এবং পরিবারের সম্মানের সঙ্গে নারীর মর্যাদাকে মিলিয়ে দেখার প্রবণতা। ২০২৪ সালে 'বিহেভিয়ার রিসার্চ মেথডস' সাময়িকীতে প্রকাশিত ১৭টি দেশের ১৩টি ভাষার ওপর পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যৌনতা ও নারীর যৌনাঙ্গকে কেন্দ্র করে অপমানসূচক শব্দের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী প্রচলিত।

বাংলা সংস্কৃতির গভীরে 'মা' শব্দটি শ্রদ্ধার প্রতীক। ২০১৫ সালে জার্নাল অব এথনোলজি অ্যান্ড ফোকলোরিস্টিকস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলা লোকসংস্কৃতিতে ‘মা’ শব্দের বিভিন্ন ব্যবহার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, এই উচ্চ মর্যাদাই বিপরীতমুখী আচরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর মতে, মা যখন যৌনতা ও সতীত্বের ধারণা দিয়ে বিচারিত হন, তখন তাঁকে অসম্মান করার মাধ্যমে সন্তানকে মানসিকভাবে গভীরভাবে আঘাত করার পথ তৈরি হয়। এটি আসলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার একটি বৈপরীত্য, যেখানে মাকে শ্রদ্ধার উচ্চাসন থেকে নামিয়ে এনে আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

এই গালিগুলোর সঙ্গে নারীর যৌনতার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, বাংলা সংস্কৃতিতে ‘মা’ শব্দটি শুধু জন্মদাত্রীকে বোঝায় না। পরিবারের অন্য নারী সদস্যদেরও মা বলে সম্বোধন করা হয়। আবার বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসে এমন দেবীদেরও ‘মা’ বলা হয়, যারা অশুভ শক্তি, দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য, অজ্ঞতা, সাপ ও রোগব্যাধি থেকে মানুষকে রক্ষা করেন বলে বিশ্বাস করা হয়। এমনকি ১৯৪৭ সালের আগে বাংলা ভূখণ্ডকেও ‘মা’ হিসেবে অভিহিত করা হতো বলে গবেষণাটিতে উল্লেখ রয়েছে। অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীনের মতে, ঐতিহাসিকভাবে নারীর সতীত্ব ও যৌন আচরণকে তার নৈতিক চরিত্রের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়। ফলে এই বিষয়টিকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করলে তা ব্যক্তিকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক একমত পোষণ করে বলেন, মানুষ অভ্যাসবশত এই ভাষা ব্যবহার করলেও এর পেছনে নারীকে হেয় করার উদ্দেশ্য থাকে। সমাজে নারীদের নিয়ে কটূক্তি ও বিদ্রূপকে অনেক সময় 'স্বাভাবিক' হিসেবে মেনে নেওয়ার ফলে মানুষ এর ভয়াবহতা নিয়ে ভাবে না।

নারীরা কেন অন্য নারীকে নিয়ে একই ধরনের গালি দেন—এই প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজ ও পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা নারী-পুরুষ উভয়কেই প্রভাবিত করে। একই সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে ওঠার ফলে নারীরাও অজান্তে সেই অপমানসূচক ভাষাই আয়ত্ত করেন। অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার রাজনীতির এই হাতিয়ারটি যখন সমাজে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন নারীরাও অনেক সময় একই ভাষা ব্যবহার করে বসেন, যা আদতে নারীর প্রতি অসম্মান ও নারীবিদ্বেষী মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh