৬৭ হাজার টাকা নিয়ে মুম্বাই এসে আজ ২০ কোটি টাকার মালিক কমেডিয়ান সুমুখী

Published: November 3, 2026, 6:02 am

নিরাপদ ও সুনির্দিষ্ট আয়ের করপোরেট জীবন ছেড়ে কমেডি জগতে নাম লেখানোর সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না সুমুখী সুরেশের জন্য। নাগপুরের এক মধ্যবিত্ত ও রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে ওঠার পর পুষ্টিবিজ্ঞান, খাদ্য ও ডায়েটেটিকস বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে খাদ্য পরীক্ষাগার ও মান যাচাই প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন তিনি। এভাবে জীবনের এক দশকেরও বেশি সময় কাটে করপোরেট খাতে। তবে কাজের পাশাপাশি নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নতুন কিছু সৃষ্টির ব্যাকুলতা তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নি। দিনভর চাকরির ঝামেলা সামলে তিনি সন্ধ্যার সময়টুকু কাজে লাগিয়ে ইম্প্রোভাইজেশন বা তাৎক্ষণিক অভিনয়ের চর্চা করতেন, যার পাশাপাশি ছোট ছোট স্কেচ ও স্ট্যান্ডআপ কমেডির কাজও চালিয়ে যেতেন।

একপর্যায়ে চাকরি ও কমেডি একসঙ্গে চালানো অসম্ভব হয়ে উঠলে সুমুখী চাকরি ছেড়ে কমেডিকেই প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নেন। সেই স্বপ্ন নিয়ে যখন প্রথম মুম্বাই শহরে পা রাখেন, তখন তাঁর ব্যাংক হিসাবে জমানো ছিল মাত্র ৫০ হাজার রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৭ হাজার টাকা)। সেই সময় তিনি ভেবেছিলেন এই অর্থ দিয়ে অন্তত তিন-চার মাস চলা সম্ভব হবে। কিন্তু মুম্বাইয়ের বাস্তবতায় এসে তিনি বোঝেন, এই টাকা এক সপ্তাহের মধ্যেই ফুরিয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সুমুখী স্মরণ করেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি না ভাবলেও পরে অনুধাবন করেছেন যে বড় পরিবর্তনের সঙ্গে বড় অনিশ্চয়তাও জড়িয়ে থাকে।

ভারতের দৈনিক জাগরণের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান সময়ে এসে সুমুখী সুরেশের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ কোটি রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২০ কোটি টাকা)। বর্তমানে নেটফ্লিক্সে তাঁর একক স্ট্যান্ডআপ কমেডি স্পেশাল ‘হোমোনাল’ নিয়ে বিনোদন জগতে তোলপাড় চলছে। ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর মুক্তি পাওয়া এ অনুষ্ঠানে সুমুখী নিজের তিরিশের দশকের জীবন, একাকিত্ব, সম্পর্কের নানা জটিলতা, হরমোনজনিত সমস্যা, শারীরিক রূপান্তর এবং বিয়ে ও মাতৃত্ব নিয়ে সমাজ থেকে আসা চাপের বিষয়গুলো রসাত্মক ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘হোমোনাল’ শব্দটি মূলত নারীদের হরমোনভিত্তিক পরিবর্তন এবং যৌনতা ও সম্পর্ক ঘিরে প্রচলিত সামাজিক মানসিকতাকে কৌতুকের ছলে চ্যালেঞ্জ করে তৈরি করা হয়েছে।

সুমুখীর এই বিশেষ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও লেখালেখি শুরু হয়েছিল ২০২১ সালে। পরবর্তীতে ভারতের বিভিন্ন শহরে নিয়মিত পরিবেশনার পর তিনি শোটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও হাজির হন। ২০২৪ সালে বিখ্যাত এডিনবরা ফ্রিঞ্জ উৎসবে অংশ নেওয়া ছিল তাঁর কমেডি ক্যারিয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। নেটফ্লিক্সের বিবরণেও বলা হয়েছে, নারীর তিরিশের কোঠার নানা অভিজ্ঞতা ও সামাজিক প্রত্যাশাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন সুমুখী।

কমেডি জগতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের যাত্রার সূচনা হয়েছিল ২০১৩ সালের দিকে বেঙ্গালুরুতে। চাকরির পাশাপাশি সেখানেই প্রথম লাইভ স্ট্যান্ডআপ শুরু করেন। এরপর ২০১৪ সালে বেঙ্গালুরুভিত্তিক কমেডি দল ‘দ্য এনথু কাটলেটস’-এর সঙ্গে ‘ানু আন্টি (দ্য ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্থেম)’ নামের একটি জনপ্রিয় প্যারোডি ভিডিওতে কাজ করে নজর কাড়েন। অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে অতি-উৎসাহী আন্টির চরিত্রে তাঁর সেই অভিনয় অনলাইনে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। পরবর্তীতে তিনি ‘বেহতি নাক’ স্কেচ ও মকুমেন্টারি সিরিজ ‘বেটার লাইফ ফাউন্ডেশন’-এ নিজের প্রতিভা দেখান।

সুমুখীর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরিয়ে দেয় অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর বহুল আলোচিত সিরিজ ‘পুষ্পাবল্লী’। এই সিরিজে মূল চরিত্র পুষ্পাবল্লীর ভূমিকায় অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি এটি সৃষ্টি ও রচনা করেন। ভালোবাসার সন্ধানে বেঙ্গালুরুতে আসা এক তরুণীর আবেগ, অধিকারবোধ ও অনুসরণের বিপজ্জনক প্রবণতাকে প্রচলিত রোমান্টিক ধারার বাইরে গিয়ে কমেডির মাধ্যমে সেখানে তুলে ধরা হয়েছিল। ২০১৭ সালে প্রথম মৌসুম এবং ২০২০ সালে দ্বিতীয় মৌসুম মুক্তির পর নির্মাতা ও অভিনেত্রী হিসেবে সুমুখী নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। ২০২১ সালে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে তাঁকে ভারতের ডিজিটাল বিনোদন ধারার শুরুর দিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্রষ্টা হিসেবে সম্মানিত করা হয়।

অভিনয় অঙ্গনে প্রচলিত সৌন্দর্যের ছকে না ফেলার কারণে সুমুখীকে মূল চরিত্রের বদলে বোন কিংবা বান্ধবীর মতো পার্শ্বচরিত্রেই বেশি প্রস্তাব দেওয়া হতো। এই হতাশা ও সীমাবদ্ধতা দূর করতেই তিনি নিজের জন্য প্রধান চরিত্র তৈরি করতে ‘পুষ্পাবল্লী’ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। একই তাগিদ থেকে ২০২১ সালে নিজের প্রযোজনা ও কনটেন্ট প্রতিষ্ঠান ‘মোটরমাউথ’ চালু করেন তিনি। সিনেমা, সিরিজ ও ব্র্যান্ড কনটেন্ট তৈরির পাশাপাশি পর্দায় নারীদের শুধু আকর্ষণীয় প্রেমিকা, আদুরে স্ত্রী বা খলনায়িকার ছকে না রেখে বাস্তব জীবনের মতো ভুল, দুর্বলতা ও শক্তির সংমিশ্রণে তুলে ধরা ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য। তাঁর মতে, ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার গল্প বদলাতে হলে নারীদের নির্মাণের নীতিনির্ধারণী জায়গাতেও সরাসরি থাকতে হবে।

‘হোমোনাল’ স্পেশালে সুমুখী নিজের এক দশকের পুরোনো ভালোবাসার সম্পর্ক ও বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা নিয়ে নিঃসংকোচে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, প্রায় ১০ বছর স্থায়ী সেই সম্পর্কে একসময় তিনি বিয়ের জন্যও প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু নিজের জীবনের নতুন দিক উন্মোচনের তাগিদে সেই সম্পর্ক থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নাগপুরের মেজাজে বেড়ে ওঠার কারণে শৈশব বা তরুণ বয়সে প্রেম বা নতুন অভিজ্ঞতার স্বাধীনতা তাঁর ছিল না। সেই প্রেক্ষাপট থেকে এখন তিনি নিজের বিশের দশকের রূপটিকে পরামর্শ দিতে চান—জীবনকে এত গুরুত্বের সঙ্গে না নিয়ে আরও বেশি আনন্দে থাকতে এবং বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ নিতে। অবশ্য পুরোনো সম্পর্ক নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই তাঁর। এদিকে করপোরেট কাজ ছেড়ে দেওয়ার পর অনেক আত্মীয়স্বজনের সমালোচনা ও দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর কৌতুকের রসদে পরিণত হয়।

ভারতে নারী কমেডিয়ান হিসেবে মঞ্চে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার পথটি যে এখনো মসৃণ নয়, সেটিও সুমুখী অকপটে স্বীকার করেছেন। ২০২৬ সালের মে মাসে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি প্রকাশ করেন, নারীর শরীর, যৌনতা কিংবা সামাজিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কথা বললে প্রতিদিন অনলাইন ট্রোলিং ও বাতিলের চেষ্টার মুখোমুখি হতে হয়। তবে এর মধ্যেই কমেডিয়ানরা নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করছেন এবং এই পেশার ভেতরে শিল্পীদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের বন্ধন আগের চেয়ে সুদৃঢ় হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের আরেক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা সৎভাবে পরিবেশন করাই তাঁর কৌতুকের মূল ভিত্তি, আর কাউকে সন্তুষ্ট করতে তিনি কখনো নিজের কণ্ঠ বা কথা বলার ধরণ পরিবর্তন করবেন না।

বর্তমানে সুমুখী সুরেশের মূল আয় আসে লাইভ শো, টিকিট বিক্রি ও আন্তর্জাতিক কৌতুক ট্যুর থেকে। ২০১৯ সালে অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পেয়েছিল তাঁর প্রথম স্ট্যান্ডআপ স্পেশাল ‘ডোন্ট টেল আম্মা’। এ ছাড়া তিনি ‘কমিকস্তান’, ‘কমেডি প্রিমিয়াম লিগ’, ‘লাস্ট স্টোরিজ’ ও ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য ফিস্ট’-এর মতো বিখ্যাত প্রজেক্টেও সফলভাবে কাজ করেছেন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo