পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রথমবারের মতো জাতীয় গ্রিডে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। পারমাণবিক বিক্রিয়া ও ভৌত পরীক্ষার (ফিজিকস টেস্ট) ফলাফল পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য ‘পাওয়ার স্টার্ট’ বা ‘সি-স্টেজ’ ধাপ শুরুর অনুমোদন দিয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রশাসনিক এই অনুমোদন মেলায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির চূড়ান্ত কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথ উন্মুক্ত হলো।
অনুমোদিত ‘সি-স্টেজ’ ধাপে শূন্য শক্তি উৎপাদন দিয়ে কার্যক্রম শুরু করা হবে এবং পরবর্তীতে পারমাণবিক চুল্লির ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান জানান, চুল্লির শক্তি উৎপাদন শূন্য থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছালেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। সে সময় গ্রিডে প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে, যা আগামী ডিসেম্বর মাস নাগাদ বাস্তবে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পাওয়ার স্টার্ট পর্যায়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে একাধিক পরীক্ষা চালানো হবে। এ প্রক্রিয়ায় চুল্লি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, টারবাইন, জেনারেটর এবং বিদ্যুৎ ও মূল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সামগ্রিক কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। মূলত পারমাণবিক বিক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ দিয়ে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ঘোরানোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিচালিত হবে। এই ধাপের প্রধান লক্ষ্য হলো জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা। পরিদর্শকদের পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে জেনারেটর যুক্ত হওয়ার পর টানা ৭ থেকে ৮ মাস পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলতে পারে।
প্রকল্প সূত্র জানায়, চুল্লিতে পারমাণবিক বিকিরণ ঘটানোর পরিকল্পনা চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে থাকলেও একটি নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় সময়সূচি পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে ত্রুটি সংশোধন করে বায়েরার অনুমোদন নিয়ে গত ১১ অক্টোবর চুল্লিতে পারমাণবিক বিক্রিয়া চালু করা হয়। এর পর পরিচালিত ভৌত পরীক্ষায় পারমাণবিক চুল্লিপাত্রের ভেতরে বিক্রিয়ার আচরণ ও উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট সব যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা যাচাই করে চূড়ান্ত সন্তুষ্টির পরই বায়েরা সি-স্টেজের অনুমোদন প্রদান করে।
জাতীয় গ্রিডে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় ৩৩তম দেশ হিসেবে যুক্ত হবে বাংলাদেশ। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান পৌঁছালে আন্তর্জাতিকভাবে পারমাণবিক স্থাপনা ও পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশের স্বীকৃতি পায় বাংলাদেশ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন পরমাণু শক্তি কমিশন দেশের সর্ববৃহৎ এই একক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যার পরিচালনায় রয়েছে এনপিসিবিএল। পাবনার রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট তৈরি করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট। রূপপুর প্রকল্পের মূল মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও তা দুই দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী সময় বাড়লেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার সুযোগ নেই, তবে মার্কিন ডলারের দরবৃদ্ধির কারণে সার্বিক প্রকল্প ব্যয় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
এটি আগামী ডিসেম্বরে হতে পারে।বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলছেন, শুরুর পর টানা ৭-৮ মাস চলতে পারে পরীক্ষামূলক উৎপাদন।





