ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মকর্তাদের গাড়ি ও যানবাহনের জ্বালানি ব্যবহারে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি নির্দেশনায় প্রাধিকারপ্রাপ্ত গাড়ির ক্ষেত্রে মাসে ২০০ লিটার এবং সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য সর্বোচ্চ ২৫০ লিটার জ্বালানির সীমা নির্ধারিত থাকলেও ডিএসসিসির কর্মকর্তারা মাসে ৪০০ থেকে ৬০০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি বরাদ্দ নিচ্ছেন। সংস্থাটির নিজস্ব কোনো জ্বালানি নীতিমালা না থাকায় বছরের পর বছর ধরে এই চর্চা চলছে। এমনকি দাপ্তরিক কাজের বাইরে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রয়োজনে গাড়ি ব্যবহার এবং রোগীদের জন্য নির্ধারিত অ্যাম্বুলেন্সে বাসা থেকে অফিসে যাতায়াতের ঘটনাও ঘটছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অতিরিক্ত বরাদ্দকৃত জ্বালানি তেল বিক্রি করে দেন চালকদের একটি অংশ, যার বিষয়ে জানা সত্ত্বেও নীরব থাকেন অনেক কর্মকর্তা।
ডিএসসিসির নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, করপোরেশনের অন্তত ৭৬ জন কর্মকর্তা নিয়মিত গাড়ি ব্যবহার করেন। বর্তমানে তাঁদের জ্বালানি খাতে বছরে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সরকারি নীতি অনুসরণ করে প্রতিটি গাড়িতে মাসিক সর্বোচ্চ ২৫০ লিটার জ্বালানি বরাদ্দ নির্ধারণ করা হলে (প্রতি লিটার সর্বোচ্চ ১৪৫ টাকা দর ধরে) মাসে খরচ দাঁড়ায় ২৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা বা বছরে ৩ কোটি ৩০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ফলে সুনির্দিষ্ট নিয়ম বাস্তবায়ন করা গেলে কেবল এই খাতেই প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। অনিয়ম ও অতিরিক্ত বরাদ্দের বিষয়ে ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম জানান, সংস্থায় নিজস্ব নীতিমালা না থাকলেও সরকারি বিদ্যমান বিধিমালা অবশ্যই মানতে হবে এবং এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই। বিষয়টিতে দ্রুত অনুসন্ধান চালিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
পরিবহন শাখার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ডিএসসিসির সচিব মো. মশিউর রহমান খান জানান, জ্বালানি বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি জানতে চেয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর পাননি; ফাইল দেখতে চাইলে অধস্তন কর্মকর্তারা জানান যে আগের কোনো কর্মকর্তা এ ফাইল দেখতে চাননি। পরিবহন বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেন যে কোনো নিজস্ব নীতিমালা না থাকায় অতীত রীতি অনুসরণ করেই বরাদ্দ চলছে। জানা গেছে, অতীতে একাধিকবার নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। সরকারি যানবাহনে ২০১০ সালের প্রজ্ঞাপন এবং ২০২০ সালের সংশোধিত নির্দেশনা থাকলেও ডিএসসিসিতে কোন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তেল বরাদ্দ হচ্ছে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
অতিরিক্ত জ্বালানি গ্রহণের নির্দিষ্ট উদাহরণের মধ্যে প্রশাসকের একান্ত সচিব মনোয়ার হোসেনের কথা বলা যায়। ধানমন্ডির বাসা থেকে নগর ভবনে অফিসে যাতায়াতে তাঁর প্রতিদিনের দূরত্ব ১১ কিলোমিটার। অথচ তাঁর গাড়িতে মাসে ৬০০ লিটার জ্বালানি বরাদ্দ রয়েছে, যার দৈনিক গড় ২০ লিটার এবং মাসিক খরচ প্রায় ৮১ হাজার টাকা। গাড়িটি প্রতি লিটারে ৫-৬ কিলোমিটার চললে ২০ লিটার জ্বালানিতে দৈনিক ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার চলার কথা। মনোয়ার হোসেন অবশ্য দাবি করেন, পরিবহন বিভাগ থেকে সরকারি নীতি অনুযায়ীই দৈনিক ২০ লিটার বা কোনো কোনো কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ১৫ লিটার বরাদ্দ নির্ধারণ করে দেওয়া হয় এবং তিনি নিজে তেল ইস্যু করেন না।
এদিকে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খয়বর রহমানের জন্য সার্বক্ষণিক ব্যবহারের পাশাপাশি আরও একটি গাড়ি সংরক্ষিত রয়েছে, যাতে দুটিতে মিলে মাসে প্রায় ৯৩০ লিটার জ্বালানি দেওয়া হয়। এর মাসিক খরচ প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৫০ টাকা এবং শুধু জ্বালানি খাতেই বছরে ব্যয় হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা। চালকদের তথ্য অনুযায়ী দ্বিতীয় গাড়িটি তাঁর কাজেই লাগে। সাবেক প্রধান নির্বাহীর সময়েও দুই গাড়ি ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছিল এবং তা নিয়ন্ত্রণে কমিটি হলেও সেই প্রথা বদলায়নি। জোড়া গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে খয়বর রহমান বলেন, দুটি গাড়ি থাকলেও তিনি সব সময় চড়েন না এবং কেবল দক্ষিণ সিটিতেই নয়, উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার জন্যও দুটি গাড়ি বরাদ্দ রাখা আছে।
গত জুন মাসের বরাদ্দের নথিতে আরও দেখা যায়, প্রশাসকের সহকারী একান্ত সচিব ফারুকুল ইসলাম সেলিমের গাড়িতে ৬০০ লিটার অকটেন (ব্যয় ৮৭ হাজার টাকা) এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন উপসচিব কর্তৃক ব্যবহৃত একটি গাড়িতেও করপোরেশনের তহবিল থেকে ৬০০ লিটার অকটেন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান তালুকদারের গাড়িতে ৫১৯ লিটার, সচিবের পদযুক্ত গাড়িতে ৪৮০ লিটার, স্থপতি মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের গাড়িতে ৪৬৫ লিটার, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবীর সোহাগের গাড়িতে ৪৫০ লিটার এবং সিস্টেম অ্যানালিস্ট মো. আবু তৈয়ব রোকনের গাড়িতে ৪০০ লিটার ডিজেল বরাদ্দ ছিল। অন্যদিকে প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আলী মনসুরের গাড়িতে ৪৭৮ লিটার, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (অঞ্চল-৬) মো. সুজাউদ্দৌলার গাড়িতে ৪৫৬ লিটার এবং সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ফাতেমা তুজ জোহরা, নূর হোসেন ও শিহাব উদ্দিনের গাড়িতে যথাক্রমে ৩১২ ও ৩৩৪ লিটার করে জ্বালানি দেওয়া হয়।
দাপ্তরিক কাজের অযুহাতে হাসপাতাল ও মাতৃসদনের অ্যাম্বুলেন্স ব্যক্তিগত চলাচলে ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সাবিনা খাতুনের নামে বরাদ্দকৃত অ্যাম্বুলেন্সে মাসে ৫১২ লিটার ডিজেল (ব্যয় ৫৮,৮৮০ টাকা), ঢাকা মহানগর শিশু হাসপাতালের ইনচার্জ পরিচালক হামিদা খাতুনের অ্যাম্বুলেন্সে ২৮৬ লিটার ডিজেল (ব্যয় ৩২,৮৯০ টাকা) এবং নাজিরাবাজার মাতৃসদনের উপপরিচালক সাথী খানমের অ্যাম্বুলেন্সে ২৩০ লিটার ডিজেল (ব্যয় ২৬,৪৫০ টাকা) খরচ দেখানো হয়েছে। তিন কর্মকর্তা মাসে মোট ১,০২৮ লিটার ডিজেল ব্যবহারে খরচ করছেন ১ লাখ ১৮,২২০ টাকা, যা বছরে দাঁড়ায় প্রায় ১৪ লাখ ১৯ হাজার টাকায়। নথি পর্যালোচনা ও অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব অ্যাম্বুলেন্স রোগীদের পরিবর্তে তাঁদের বাসা থেকে অফিসে আসা-যাওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
করপোরেশনের ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে চালকদের একাংশ অতিরিক্ত তেল বিক্রিকে উপার্জনের পথ বানিয়ে নিয়েছেন। হঠাৎ এটি বন্ধ করলে তাঁদের অসন্তোষ তৈরির আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ কড়াকড়ি করছে না। এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জনগণের অর্থে চলা প্রতিষ্ঠানে নীতিবহির্ভূত সুবিধা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দ্রুত জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং কঠোর নীতিমালা মেনে চলা বাধ্যতামূলক করতে হবে, তা না হলে এই অনাচার ঘটতেই থাকবে।





