দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বার্লিনে বসবাস করছেন ডেনমার্কের খ্যাতনামা গায়িকা, গীতিকার ও পিয়ানোবাদক অ্যাগনেস ওবেল। এই শহরেই তৈরি হয়েছিল তার আন্তর্জাতিক প্রশংসিত প্রথম অ্যালবাম ‘ফিলহারমনিকস’। পিয়ানোর কোমল সুর, মৃদু কণ্ঠস্বর এবং লোককথা ও প্রকৃতির নীরব বিষণ্নতার সমন্বয়ে তিনি এক অনন্য সংগীতজগৎ গড়ে তুলেছেন। দীর্ঘ বিরতির পর গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে তার নতুন অ্যালবাম ‘দ্য মিনিং অব ফ্লাওয়ার্স’ (ফুলের অর্থ)। সন্তান জন্মদানের পর এটিই তার প্রথম অ্যালবাম, যেখানে রূপান্তর, আত্মিক বৃদ্ধি, ঘনিষ্ঠতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের গভীর সম্পর্ক প্রতিফলিত হয়েছে। ডেনিশ এই সংগীতশিল্পী সম্প্রতি ‘দ্য বার্লিনার’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তার নতুন অ্যালবাম, বার্লিনের জীবন এবং মাতৃত্ব কীভাবে তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে, তা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সেই সাক্ষাৎকারটিই পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
প্রকৃতির সঙ্গে তার সংগীতের গভীর সম্পর্কের বিষয়ে ওবেল জানান, প্রকৃতির দৃশ্য ও গতিপ্রকৃতি মানুষের চিন্তাভাবনাকে বুঝতে সাহায্য করে। নতুন অ্যালবামের কাজ করার সময় বেড়ে ওঠা ও নতুন করে শুরু করার ভাবনা থেকেই গাছপালার সঙ্গে তার সংযোগ আরও নিবিড় হয়ে ওঠে। তবে প্রকৃতির টানে নয়, কাজের একটু স্বাধীন জায়গা পাওয়ার আশাতেই তিনি বার্লিনে এসেছিলেন। কোপেনহেগেনের ছোট্ট এক ফ্ল্যাটে অ্যানিমেটর সঙ্গীর সঙ্গে প্রতিদিন মুখোমুখি বসে কাজ করতে হতো, যেখানে নিজের মতো ভাবার কোনো অবকাশ ছিল না। ট্রান্সমেডিয়ালে আয়োজনে বার্লিনের হাউস ডের কালচারেন ডের ভেল্ট পরিদর্শনের পর সেখানকার সাশ্রয়ী স্টুডিও স্পেস দেখে তার কাছে শহরটিকে স্বর্গ মনে হয়েছিল। সেখানে একটি রেস্তোরাঁ ছিল যেখানে ইচ্ছামতো দাম দিয়ে খাওয়া যেত। কোপেনহেগেনে তরুণ বয়স থেকেই যেখানে ভবিষ্যৎ ও ফ্ল্যাট কেনার চিন্তায় মানুষ ব্যস্ত থাকে, বার্লিনে এসে তিনি জীবনের ভিন্ন এক অবাধ গতি দেখতে পান। এরপর হুমবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইরাসমাস কর্মসূচিতে ভর্তির সুযোগকে অজুহাত বানিয়ে তিনি সঙ্গীকে নিয়ে বার্লিনে পাড়ি জমান।
সংগীত থেকে আয় করা অর্থ ওবেল সব সময় নিজের কাজের জায়গা তৈরিতেই ব্যয় করেছেন। বার্লিনের নয়ক্যোলনে তাদের একটি বড় ফ্ল্যাট ছিল, যেখানে তিনি গান রেকর্ড করতেন এবং তার সঙ্গী অ্যানিমেশনের কাজ করতেন। তবে ‘সিটিজেন অব গ্লাস’ অ্যালবামের কাজ শেষের দিকে নিচতলায় একটি ভিয়েতনামি রেস্তোরাঁ চালুর পর নতুন বিপত্তি ঘটে। রেস্তোরাঁর বিশাল এয়ার কন্ডিশনার দুপুর ১২টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত পুরো ফ্ল্যাট কাঁপিয়ে রাখত, যার ফলে বাধ্য হয়ে অন্য কোথাও স্টুডিও ভাড়া নিতে হয়। বর্তমানে তার নিজস্ব একটি নিরাপদ স্টুডিও থাকলেও পাঁচ বছরের কন্যাসন্তানের মা হওয়ার পর শহরের ব্যস্ত যানবাহন তার কাছে ভীতিজনক মনে হয়। তাই শহরের একদম কেন্দ্রে না থেকে অন্য কোথাও স্থানান্তরিত হওয়ার কথা ভাবছেন তিনি।
চলতি গ্রীষ্মে গার্টেন ডের ভেল্টে সংগীত পরিবেশনের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, জায়গাটি চমৎকার হলেও অ্যাকুস্টিক বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বাজানো কিছুটা কঠিন ছিল। কারণ মঞ্চ থেকে শব্দ প্রতিফলিত হয়ে সাউন্ড সিস্টেমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যা করছিল, যদিও শ্রোতা ও পরিবেশ ছিল দারুণ। এর আগে তিনি অ্যাডমিরালস্পালাস্টে অনেকবার বাজিয়েছেন, যা তার খুব পছন্দের জায়গা। অন্যদিকে ফিলহারমোনিতে অ্যাকুস্টিক বাদ্যযন্ত্রের উপযোগী পরিবেশ হওয়ায় পরিবর্ধিত শব্দের ভারসাম্য বজায় রাখা কিছুটা কঠিন হতো। ওবেল জানান, তারা মঞ্চে পিয়ানো, ড্রামস ও চেলো নিয়ে কাজ করেন এবং তিনি খুব জোরে গান গান না, ফলে মঞ্চে দাঁড়িয়ে শ্রোতাদের কাছে শব্দের সঠিক ভারসাম্য পৌঁছানো বেশ জটিল এক চ্যালেঞ্জ।
নতুন অ্যালবামে পিয়ানোর পাশাপাশি সিনথেসাইজারের ব্যাপক ব্যবহার প্রসঙ্গে ওবেল ব্যাখ্যা করেন, পিয়ানো তার মূল যন্ত্র হলেও নতুন আবেগের বহিঃপ্রকাশে কেবল তা যথেষ্ট মনে হচ্ছিল না। আগে হালকা ব্যবহার করলেও এবার ইলেকট্রনিক শব্দের বৈচিত্র্য বাড়াতে সিনথেসাইজার ব্যবহারে জোর দিয়েছেন। বার্লিনে নিউম্যানসের মাধ্যমে যুক্ত ‘অরকেস্ট্রাল টুলস’ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছ থেকে তিনি দারুণ কিছু কোরাস স্যাম্পল ও প্লাগইন পান। এছাড়া একজন স্ট্রিংবাদকের সুর এমনভাবে রেকর্ড করেন যেন পুরো একটি স্ট্রিং সেকশন বাজছে। পুরো অর্কেস্ট্রা ভাড়া করার সামর্থ্য না থাকায় বার্লিনের প্রযুক্তিগত ও সংগীতাঙ্গনের এই সুযোগ তাকে এক বিশাল শব্দের জগৎ তৈরিতে সাহায্য করেছে।
অন্য শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে জানান ওবেল। ‘ডিভাইড অ্যান্ড ডিসলভ’ প্রজেক্টের স্যাক্সোফোনবাদক তাকিয়াইয়া রিডের কাজ দেখে তিনি তাকে অনুসরন করতে শুরু করেন। তাকিয়াইয়া তাকে দীর্ঘ বার্তা পাঠিয়ে নিজ কনসার্টে আমন্ত্রণ জানান। কন্যাসন্তানের জন্মের পর সেটিই ছিল ওবেলের দেখা প্রথম কোনো উচ্চশব্দের কনসার্ট, যেখানে সংগীতের তীব্রতায় নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ডুবে যাওয়ার এক অসাধারণ অনুভূতি পেয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে তাকিয়াইয়া কয়েক মাস বার্লিনে ওবেলের স্টুডিওতে থাকেন এবং নতুন অ্যালবামের দুই-তিনটি গানে চমৎকার স্যাক্সোফোন বাজান।
নিজের কাজের স্বাধীনতা ও পদ্ধতির পেছনে বার্লিনের ইলেকট্রনিক সংগীতের পরিবেশের বড় প্রভাব রয়েছে বলে জানান এই শিল্পী। প্রথম অ্যালবামের গানগুলো ডেনমার্কে ও হাইস্কুলে পড়ার সময় লেখা হলেও বার্লিনে এসেই নিজের কাজের ওপর তার আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে। এখানে মাউস অন মার্স, অ্যাপেক্স টুইন কিংবা স্কয়ারপুশারের মতো ইলেকট্রনিক শিল্পীদের কাজ দেখে তিনি শেখেন যে গান বানানোর জন্য আলাদা প্রযোজক বা গীতিকার ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করা সম্ভব। নিজেকে একটি 'মাশরুমের' সঙ্গে তুলনা করে ওবেল বলেন, তিনি চারপাশের পরিবেশ থেকে উপাদান শুষে নিয়ে নিজের ভেতরে নতুন কিছু তৈরি করেন।
নতুন অ্যালবামের ‘দ্য মিনিং অব ফ্লাওয়ার্স’ নামটি অলিভার স্যাক্সের ‘দ্য রিভার অব কনশাসনেস’ বইয়ের ‘ডারউইন অ্যান্ড দ্য মিনিং অব ফ্লাওয়ার্স’ অধ্যায় থেকে অনুপ্রাণিত। ওবেলের মতে, ফুল কেবল একটি উদ্ভিদ নয়; তার সংক্ষিপ্ত জীবনের ভেতরেই ফুটে ওঠে জন্ম, বেড়ে ওঠা ও ঝরে পড়ার এক মহাজাগতিক সত্য। সমগ্র মহাবিশ্বকে বুঝতে হলে অনেক সময় আকাশের দিকে না তাকিয়ে একটি ক্ষুদ্র ফুলের দিকে গভীরভাবে তাকালেই জীবনের আসল অর্থ অনুধাবন করা সম্ভব।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালে প্রকাশিত প্রথম অ্যালবাম ‘ফিলহারমনিকস’ দিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া অ্যাগনেস ওবেল পরবর্তীতে ‘অ্যাভেনটিন’, ‘সিটিজেন অভ গ্লাস’ ও ‘মাইওপিয়া’ অ্যালবামের মাধ্যমে নিজের পরিচিতি জোরদার করেন। প্রচলিত পপসংগীতের জাঁকজমক এড়িয়ে নীরবতা ও সুরের সূক্ষ্মতাকে প্রাধান্য দেওয়া এই শিল্পীর ২০২৬ সালের নতুন অ্যালবামটি মাতৃত্ব, জন্ম ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের এক অনবদ্য দলিল।





