সৌদি আরবে এক নারীসহ দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি বিদেশের মাটিতে প্রবাসী কর্মীদের আইনি ও সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব হলেও দেশটির কারাগারে বন্দি রয়েছেন প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি। সেই হিসাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারাগারে আটক থাকা মোট বাংলাদেশি বন্দির ৭৪ দশমিক ৫০ শতাংশই সৌদি আরবে রয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, পাঁচ দশক পার হলেও প্রবাসী কর্মীদের জন্য কার্যকর কোনো আইনি সুরক্ষাকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি, যার কারণে অনেক সময় বানোয়াট বা লঘু অপরাধেও গুরুদণ্ড ভোগ করতে হচ্ছে প্রবাসীদের।
প্রবাসে আইনি সুরক্ষার এই করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে ময়মনসিংহের ভালুকার বাসিন্দা আলী হোসেনের (২১) তিক্ত অভিজ্ঞতায়। গরিব কৃষক বাবার সন্তান আলী হোসেন ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ধারদেনা করে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। একটি প্রতিষ্ঠানে খাবার ডেলিভারিম্যান হিসেবে প্রতি মাসে আড়াই হাজার রিয়াল বেতনের চুক্তিতে যোগ দিলেও কিছুদিন পর থেকে তাঁকে ৫০০ রিয়ালের বেশি দেওয়া হতো না। পাওনা টাকা না পেয়ে দেশে ফিরে আসার কথা জানালে তাঁর কফিল (নিয়োগকর্তা) আট হাজার রিয়াল ধার নেওয়া ও মোটরসাইকেল চুরির মিথ্যা অভিযোগ এনে মামলা ঠুকে দেন। এর পর জেদ্দার কারাগারে টানা সাত মাস বন্দি থাকতে হয় তাঁকে।
আলী হোসেন জানান, গ্রেপ্তারের পর সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে কেউ তাঁর কোনো খোঁজ নেয়নি, এমনকি তাঁকে আদালতেও তোলা হয়নি। সাত মাসের বন্দিজীবনে পরিবারের সঙ্গে মাত্র চারবার যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কারাগারে রেজওয়ান নামের আরেক বাংলাদেশি বন্দির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়, যিনি এখনো মুক্ত হতে পারেননি। সম্প্রতি দেশে ফিরে আসা আলী হোসেনদের মতো অনেকেই বিদেশের মাটিতে কারাভোগের সেই যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন এবং দেশে ফিরে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে সংগ্রাম করছেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সৌদি আরবের পর ভারতে এক হাজার ৫৭৯ জন, তুরস্কে ৫০৮, ওমান ও কাতারে ৪২০ জন করে, গ্রিসে ৪১৪, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪০৪, দক্ষিণ আফ্রিকায় ৩৮৫ এবং মালয়েশিয়ায় ২১৯ জন বাংলাদেশি কারাগারে আটক রয়েছেন। তবে বিদেশে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর মতে, প্রকৃত বন্দির সংখ্যা সরকারি তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি, কারণ অনেক দেশের কারাগারের প্রকৃত চিত্র সরকারের কাছে নেই। অন্যদিকে, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আউট পাস নিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন ৫৩ হাজার ২১২ জন বাংলাদেশি, যাদের মধ্যে ৩৩ হাজার ৬১১ জনই বা ৬৩.১৬ শতাংশ এসেছেন সৌদি আরব থেকে।





