হবিগঞ্জে ৮ মাসেও হয়নি প্লটের লটারি, এমপি’র অনুরোধে নতুন আবেদনের তোড়জোড়

Published: October 23, 2026, 9:03 am

সরকারি আবাসিক প্লটের প্রত্যাশায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জামানত দিয়ে আট মাস ধরে অপেক্ষা করছেন হবিগঞ্জের শত শত মানুষ। তবে দীর্ঘদিনে লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ না দিয়ে উল্টো নতুন করে আবেদনপত্র সংগ্রহের প্রস্তুতি শুরু করেছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। এর ফলে বরাদ্দ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা স্থানীয় স্বল্প ও মধ্যম আয়ের আবেদনকারীদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সূত্রমতে, হবিগঞ্জ শহরতলির ধুলিয়াখাল এলাকায় ২০১৬ সালে সিলেট বিভাগের অধীনে ‘সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়। ২০১৭ সালে ২৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন পায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ এবং ভূমি উন্নয়নে মাটি ভরাটের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ২.৫ থেকে ৫ কাঠা ও তার চেয়ে বেশি আয়তনের মোট ১৩২টি আবাসিক প্লট রয়েছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এসব প্লটের জন্য আবেদন আহ্বান করে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। সে সময় এক হাজার টাকা মূল্যে প্রায় ১১০০টি আবেদনপত্র বিক্রি হয়। গত ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে আবেদনের সময়সীমা শেষ হওয়া পর্যন্ত জামানতসহ মোট ৬৯৬টি আবেদন জমা পড়ে। চার কাঠা ও তদূর্ধ্ব আয়তনের প্লটের জন্য দুই লাখ এবং চার কাঠার নিচের প্লটের জন্য দেড় লাখ টাকা করে জামানত রাখা হয়। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের অনুকূলে জমা হওয়া এই জামানতের মোট পরিমাণ প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।

নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি প্লটের বিপরীতে গড়ে পাঁচটির বেশি আবেদন জমা পড়ার পর লটারি প্রক্রিয়া শুরু করার কথা ছিল। তবে হবিগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ জি কে গউছ নতুন করে আবেদন নেওয়ার জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। সেই চিঠির পর স্থগিত করা হয় প্লট বরাদ্দের লটারি কার্যক্রম। একই সঙ্গে দ্রুত সময়ের মধ্যে পুনরায় আবেদন চেয়ে নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

এমপি জি কে গউছ এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে যখন বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল, তখন অনেকেই বিষয়টি জানতে পারেননি। নতুন করে আবেদন চাওয়া হলে মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে। তিনি চান আরও বেশি আবেদন জমা পড়ুক, তবে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে যেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় থাকে এবং তা লটারির মাধ্যমেই হয়—সেটা সবার খেয়াল রাখা উচিত।

এদিকে নতুন করে আবেদন আহ্বানের সিদ্ধান্তের খবরে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, আট মাস পর হঠাৎ নিয়ম ভেঙে নতুন আবেদনের সুযোগ দেওয়ার অর্থ রাজনৈতিক প্রভাবে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নিংতির সুযোগ তৈরি করা। শহরটির ব্যবসায়ী কামাল আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সরকারি সব নিয়ম মেনে আবেদন করার পর প্লট বরাদ্দের ঠিক আগমুহূর্তে নতুন আবেদনের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে দলীয় নেতা-কর্মীদের যুক্ত করার জন্য। এর মাধ্যমে তাঁদের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের জায়গায় অনিয়মের পথ খুলে দেওয়া হচ্ছে।

একই হতাশার কথা জানান বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত মো. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, সীমিত আয়ের মানুষ হয়েও অনেক আশা নিয়ে প্লটের জন্য আবেদন করেছিলেন। একটি প্লটের বিপরীতে এমনিতেই পাঁচ থেকে ছয়টি আবেদন রয়েছে, সেখানে আট মাস পর কেন আবার নতুন আবেদন জমা নিতে হবে, তা বোধগম্য নয়।

প্রকল্পের বিবরণপত্র (প্রসপেক্টাস) থেকে জানা গেছে, প্রকল্পে কাঠাপ্রতি জমির আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে ৫ লাখ ১৩ হাজার টাকা। বরাদ্দ প্রাপ্ত ব্যক্তিরা এককালীন বা কিস্তিতে এই অর্থ পরিশোধের সুযোগ পাবেন। আর যাঁরা লটারিতে প্লট পাবেন না, তাঁদের জমা দেওয়া জামানতের টাকা ফেরত দেওয়ার কথা রয়েছে। বরাদ্দপত্র পাওয়ার পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী অবশ্যই বাড়ি নির্মাণ করতে হবে, অন্যথায় জমা অর্থের পাঁচ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করে বরাদ্দ বাতিল করা হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক মিছবাহুল বারী এ বিষয়ে বলেন, স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ নিজেদের শেষ সম্বল দিয়ে জামানতের অর্থ জমা দিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে টাকা আটকে থাকায় অনেকেই অসহায় বোধ করছেন। রাজস্ব আদায়ের অজুহাতে বা নতুন করে আবেদন নেওয়ার নামে প্রক্রিয়াকাজে দেরি করা হলে সাধারণ মানুষ চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল জমা থাকা আবেদন থেকেই লটারির আয়োজন করা।

পরিস্থিতি বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সিলেট বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) নেজামুল হক মজুমদার জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিশেষ অনুরোধে মন্ত্রণালয় থেকে পুনরায় আবেদন নেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে। পূর্বের জমা হওয়া আবেদনের সঙ্গে নতুন আবেদনগুলো যুক্ত করে পরবর্তীতে লটারির মাধ্যমে প্লট বরাদ্দ হবে। সাধারণ আবেদনকারীরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন সে চেষ্টা তাঁর ছিল উল্লেখ করে তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুসারেই এখন নতুন বিজ্ঞপ্তির কাজ চলছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo