বাংলাদেশে পরিবার কিংবা আত্মীয়দের মধ্যে জমি ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো দান বা হেবা। তবে এ ধরনের হস্তান্তরে কী পরিমাণ কর প্রযোজ্য কিংবা আদৌ কর দিতে হবে কি না, তা নিয়ে প্রায়শই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। প্রকৃতপক্ষে এই করদায় নির্ভর করে লেনদেনের আর্থিক ও আইনি প্রকৃতি, দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট আইনের ওপর। দানকর আইন ১৯৯০, আয়কর আইন ২০২৩ এবং ২০২৬ সালের অর্থ আইনের সংশোধনী বিশ্লেষণ করে আর্থিক খাত বিশ্লেষক ও ফেলো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফয়সাল ইসলাম বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন।
দানকর আইন, ১৯৯০-এর ২ ধারা অনুসারে কোনো ব্যক্তি যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে ও বিনা প্রতিদানে নগদ টাকা, জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট কিংবা কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অন্য কাউকে হস্তান্তর করেন, তবে তা ‘দান’ হিসেবে বিবেচিত হয়। দলিলে এটি ‘হেবা’, ‘উপহার’ কিংবা ‘দান’—যে নামেই উল্লেখ থাকুক না কেন, কর আইন লেনদেনের মূল বৈশিষ্ট্যকেই প্রাধান্য দেয়। এই আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী ১৯৯০ সালের ১ জুলাই থেকে আইনগত অব্যাহতি না থাকলে নির্ধারিত হারে দানকর পরিশোধের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই দানকর পুরোপুরি দাতার দায়িত্ব, যা গ্রহীতার আয়কর দায় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী বেশ কিছু ক্ষেত্রে দানকর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত সম্পত্তি, সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে প্রদত্ত দান এবং নির্দিষ্ট শর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা দুর্যোগ তহবিলে করা দান করমুক্ত। এ ছাড়া নির্ভরশীল আত্মীয়ের বিয়েতে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দান, উইল বা অসিয়ত, মৃত্যুশয্যাজনিত দান এবং নির্দিষ্ট বিমা পলিসি এই অব্যাহতির আওতাভুক্ত। পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পিতা, মাতা, পুত্র, কন্যা, স্বামী, স্ত্রী এবং আপন ভাই-বোনকে দেওয়া দান সম্পূর্ণ দানকরমুক্ত। তবে দাদা-নাতি, নানা-নাতনি, চাচা-ভাতিজা, মামা-ভাগনে কিংবা বন্ধুদের মধ্যকার দান স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত নয়। এসব অব্যাহতির বাইরে একজন দাতা এক অর্থবছরে মোট ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দান করলে তা দানকরমুক্ত থাকে, যা পুরো অর্থবছরের মোট দানের মূল্যের ওপর প্রযোজ্য।
অ-নগদ সম্পত্তি যেমন জমি বা ফ্ল্যাট দানের ক্ষেত্রে তার মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা দানকর আইন, ১৯৯০-এর ৫ ধারায় বলা হয়েছে। দানের তারিখে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি খোলাবাজারে যে দামে বিক্রি হতে পারত, সেটিকে করযোগ্য মূল্য হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে দলিলে প্রদর্শিত কম মূল্য সরাসরি গ্রহণ না-ও হতে পারে। খোলাবাজারের মূল্য নির্ধারণ কঠিন হলে বিধিতে উল্লিখিত নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে করযোগ্য মূল্য নিরূপণ করা হয়।
দানকরের ক্ষেত্রে প্রগতিশীল বা ধাপভিত্তিক করহার প্রযোজ্য। আইনের তফসিল অনুযায়ী, করযোগ্য দানের প্রথম ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ৫ শতাংশ, পরবর্তী ১০ লাখ টাকায় ১০ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকায় ১৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট মূল্যের ওপর ২০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হয়। কোনো দানের মোট মূল্যের ওপর সরাসরি সর্বোচ্চ হার বসানো হয় না, বরং প্রতিটি ধাপের জন্য নির্ধারিত হার প্রযোজ্য হয়। ধারা ৭ অনুযায়ী, কোনো অর্থবছরে করযোগ্য দান করলে পরবর্তী কর বছরের ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট উপ-কর কমিশনারের কাছে নির্ধারিত ফরমে রিটার্ন দাখিল করতে হয়। উপ-কর কমিশনার চাইলে ন্যূনতম ৩০ দিনের নোটিশ দিয়ে রিটার্ন জমা দেওয়ার নির্দেশও দিতে পারেন, যা যুক্তিসংগত কারণে বৃদ্ধি করা সম্ভব।
দানকর ও গ্রহীতার আয়কর সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ৬৬ ধারা অনুযায়ী দান বা উপহারকে ‘অন্যান্য উৎস হতে আয়’ হিসেবে ধরা হয়। তবে ষষ্ঠ তফসিলের অংশ-১-এর ৩৫ দফা অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, মাতা-পিতা ও আপন ভাই-বোনের কাছ থেকে প্রাপ্ত দান গ্রহীতার হাতে আয়করমুক্ত থাকবে, যদি উভয় পক্ষ তা নিজ নিজ আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করেন। দাতা বিদেশে অবস্থান করে ব্যাংকিং চ্যানেলে দান পাঠালে দাতার রিটার্নে প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকে না।
সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১২৫ ধারায় নতুন উপধারা (২ক) যুক্ত করা হয়েছে, যা ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর। এই বিধান এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গত ৭ জুলাইয়ের স্পষ্টীকরণ অনুসারে, হেবা বা দানের ক্ষেত্রে দানকর আইন প্রযোজ্য হলে দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় সাব-রেজিস্ট্রার বা নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা এ-চালানের মাধ্যমে প্রযোজ্য দানকর সংগ্রহ করবেন। ফলে আলাদা করে আর উৎস কর কাটার প্রয়োজন হবে না। তবে এই নিয়ম কেবল হেবা ও দানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নয়। মুসলিম আইনে হেবার স্বতন্ত্র রূপ রয়েছে এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-তে এর স্বীকৃতি থাকলেও, কর ধার্যের ক্ষেত্রে দলিলে ব্যবহৃত শব্দ নয় বরং স্বেচ্ছায় ও বিনা প্রতিদানে হস্তান্তর হয়েছে কি না এবং আইনের অব্যাহতি পাওয়া যায় কি না, তা যাচাই করেই কর নির্ধারণ করা হয়।





