উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্র সংস্কারে বিউপনিবেশায়ন ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা

Published: October 18, 2026, 6:50 pm

বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। তবে সেই মরণপণ মুক্তিযুদ্ধে দেশের অপরাপর অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন। এমনকি তাঁদের বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে স্বাধীনতা-উত্তর সরকার কাউকে কাউকে রাষ্ট্রীয় খেতাবেও ভূষিত করে। তা সত্ত্বেও ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রীয় অন্যতম মূলনীতি হিসেবে কেবল ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে স্থান দেয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে (তথ্যসূত্র ২৮৬) জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞায় বলা হয়, “ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।” মূল ভূখণ্ডের বাইরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি থেকে পৃথক সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে এই বিধান যুক্ত করা হলেও, এর মাধ্যমে স্বাধীনতায় অবদান রাখা অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয় তৎকালীন শাসকশ্রেণি।

স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি শাসকশ্রেণির অতি-জাতিবাদী অবস্থানের কারণে অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোকে ‘উপজাতি’র অধস্তন মর্যাদায় চিহ্নিত করা হয়। সে সময় তৎকালীন প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রকাশ্যে এসব অবাঙালি জনগোষ্ঠীকে ‘বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহ্বান’ জানান (তথ্যসূত্র ২৮৭: আনিসুজ্জামান, “আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও সংবিধানের মূলনীতি”, বাঙালী ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা: ১১৪)। একইসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু শ্রেণিকে নিছক ‘ট্রাইব’ আখ্যা দিয়ে নিজের তথাকথিত ঔদার্যের মাধ্যমে তাদের ‘বাঙালি’ পদে উন্নীত বা প্রমোশন দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। গবেষক ড. মিজানুর রহমান শেলী সম্পাদিত গ্রন্থ 'দ্য পার্বত্য চট্টগ্রাম অব বাংলাদেশ: দ্য আনটোল্ড স্টোরি' (Dr. Mizanur Rahman Shelley (ed.) The Chittagong Hill Tracts of Bangladesh: The Untold Story, p. 124, তথ্যসূত্র ২৮৮)-তে এই প্রেক্ষিতটি তুলে ধরা হয়েছে। বর্ণবাদী ও উগ্র জাতিবাদী রাজনৈতিক চিন্তার এই প্রকাশ বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মানির ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদের সঙ্গেই দৃশ্যত তুলনীয়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শাসনামলে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়, যা সব নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়াস ছিল। কিন্তু তখনও শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে অবাঙালিদের ‘ট্রাইব’, ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’র মতো উপনিবেশবাদী নেতিবাচক বিশেষণে সংজ্ঞায়িত করার মানসিকতা বজায় থাকে।

সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর পরিচয় সম্পর্কিত বিতর্ক ও পর্যালোচনার ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে একটি পরস্পরবিরোধী পরিবর্তন নিয়ে আসে। ২০১১ সালে সংশোধিত সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬[২]-এ (তথ্যসূত্র ২৮৯: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ২০১১, অনুচ্ছেদ ৬[২]) উল্লেখ করা হয়, “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।” এর ফলে নাগরিকদের জাতীয় পরিচয় হিসেবে শেষ পর্যন্ত ‘বাঙালি’ সত্তাকেই চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীগুলোর পৃথক অস্তিত্বের অস্বীকৃতি তৈরি করে। একই সময়ে লীগ সরকার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে একদিকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ পুনর্বাহল করে, অন্যদিকে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে রেখে দিয়ে এক ধরনের সুবিধাবাদী অবস্থান গ্রহণ করে। একটি রাষ্ট্র একই সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে না। যখন রাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে সংখ্যালঘুদের বিশ্বাসকে অধস্তন করে, তখন তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র হারায়। এটি মূলত শাসকশ্রেণির ঔপনিবেশিক ও আধিপত্যবাদী মনস্তত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এশিয়া, আফ্রিকা ও দুই আমেরিকায় ভাষা, শিক্ষা ও ইতিহাসের রাজনীতি ব্যবহার করে শোষণ প্রক্রিয়া বজায় রেখেছিল। সেই ঔপনিবেশিক নিপীড়নের দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব আজও উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তরুণ প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাস জানা গুরুত্বপূর্ণ হলেও পুরনো ঔপনিবেশিক শাসক দলকে নিরন্তর অভিশাপ না দিয়ে নিজেদের সমতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের দিকে মনোযোগ দেওয়া আবশ্যক। বাংলাদেশসহ সব উপনিবেশোত্তর সমাজকে প্রকৃত গণতান্ত্রিক মুক্তি পেতে হলে পশ্চিমা ইতিহাসচর্চা, উগ্র জাতিচিন্তা ও ধর্মীয় আধিপত্য থেকে বের হয়ে আসতে হবে, যার পূর্বশর্ত হলো শাসকশ্রেণিসহ সর্বসাধারণের মন ও মননের বিউপনিবেশায়ন (decolonization of mind)।

এই গণতান্ত্রিক রূপান্তর অর্জনে দুটি মূল সতর্কতামূলক বিষয় মনে রাখা জরুরি। প্রথমত, আমাদের নিজেদের ইতিহাসকে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক বয়ান থেকে মুক্ত করে বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে হবে, তবে আন্তর্জাতিক স্তরে আধুনিক পশ্চিমা গবেষকদের গবেষণাপদ্ধতি ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের কৌশলগুলো আয়ত্ত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ঔপনিবেশিক ভাষার প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে জীবনের সব পরিসরে নিজস্ব মাতৃভাষার সর্বাত্মক চর্চা ও বিকাশ ঘটাতে হবে। তবে এর মানে এই নয় যে অন্য সমৃদ্ধ বিদেশি ভাষা চর্চা পরিত্যাগ করতে হবে; কারণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু সর্বজনীন আবিষ্কার ওই ভাষাগুলোতে লিপিবদ্ধ রয়েছে। প্রখ্যাত সমাজ ও শিক্ষা সংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা (বিদ্যাসাগর) তাঁর ‘বাক্যকথন – ভাষা’ প্রবন্ধে (বোধোদয়, পৃষ্ঠা: ৩২, তথ্যসূত্র ২৯০) লিখেছিলেন, “ইংরেজরা এক্ষণে আমাদের দেশের রাজা। সুতরাং ইংরেজি আমাদের রাজভাষা। এ নিমিত্ত সকলে আগ্রহপূর্বক ইংরেজি শিখে। কিন্তু অগ্রে জাতি ভাষা না শিখিয়া পরের ভাষা শিখা কোনও মতে উচিত নহে।” অর্থাৎ নিজস্ব ভাষার ভিত্তি মজবুত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভাষাগুলোর ওপর দখল বাড়ালে সর্বজনীন জ্ঞানে প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি পায়, যা রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি ও ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin