জাতিসংঘে ‘সঠিক মানচিত্র’ প্রস্তাব পাস, বিপক্ষে ভোট দিল একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র

Published: September 18, 2026, 3:42 pm

বিশ্বকে দেখার প্রচলিত মানচিত্র বদলে দেওয়ার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ (মানচিত্র সংশোধন) সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব ১৬৪-১ ভোটে গৃহীত হয়েছে। আফ্রিকার দেশ টোগোর উদ্যোগে এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের সমর্থনে এই প্রস্তাবটি পাস হয়। প্রস্তাবটিতে মূলত ‘ইকুয়াল আর্থ’-এর মতো সম-আয়তনভিত্তিক মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, যা মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তনকে সঠিকভাবে তুলে ধরে। এই ঐতিহাসিক প্রস্তাবের বিপক্ষে একমাত্র দেশ হিসেবে ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইউরোপের ছয়টি দেশ—এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলদোভা, সার্বিয়া ও ইউক্রেন ভোটদানে বিরত ছিল।

আপাতদৃষ্টিতে এটি কেবল একটি মানচিত্রের প্রজেকশন বদলানোর বিষয় মনে হলেও, এর পেছনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও ক্ষমতার প্রশ্ন লুকিয়ে রয়েছে। বহুকাল ধরে প্রচলিত ১৫৬৯ সালে জেরারডাস মার্কেটরের তৈরি করা ‘মার্কেটর প্রজেকশন’ মানচিত্রে পৃথিবীর উচ্চ অক্ষাংশের ভূখণ্ডকে অস্বাভাবিক বড় দেখায়। এর ফলে মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার প্রায় সমান মনে হয়, অথচ বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়। মার্কেটর মূলত নৌযাত্রায় দিকনির্দেশনা ও কম্পাস বিয়ারিং সঠিক রাখার উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করেছিলেন, আফ্রিকাকে ছোট করার কোনো ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্র থেকে নয়। তবে শৈশব থেকে এই মানচিত্র দেখে বড় হওয়া মানুষের মনে অবচেতনভাবেই বৈশ্বিক শক্তি ও গুরুত্বের একটি ভ্রান্ত সমীকরণ তৈরি হয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গির লড়াইটি আসলে উপনিবেশবাদের গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের অংশ। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ কেবল এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার জাগতিক সম্পদই লুণ্ঠন করেনি, বরং জ্ঞান ও মনোজগতের ওপরও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৮৩৫ সালে টমাস ব্যাংবিংটন মেকলের ‘মিনিট অন ইন্ডিয়ান এডুকেশন’ এর একটি বড় উদাহরণ, যেখানে তিনি এমন এক ভারতীয় শ্রেণি তৈরির কথা বলেছিলেন যারা রক্তে-বর্ণে ভারতীয় হলেও রুচি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে হবে ইংরেজ। এডওয়ার্ড সাইদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ এবং ফ্রাঞ্জ ফানোর তত্ত্বও দেখায় কীভাবে পশ্চিমা জ্ঞানকাঠামো অন্যকে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা নিজের হাতে রেখে শাসন জারি রাখে এবং শাসিত মানুষকে নিজের মর্যাদা বুঝতেও শাসকের চোখ ব্যবহারে বাধ্য করে।

মানচিত্রে ভূখণ্ডের এই দৃশ্যমান অসমতা কেবল রুটি-রুজির বণ্টন নয়, বরং স্বীকৃতি ও মর্যাদার বঞ্চনার সঙ্গেও যুক্ত। জাতিসংঘের এই প্রস্তাবটি কোনো বাধ্যতামূলক আইন নয় এবং এটি মার্কেটর প্রজেকশন বা গুগল ম্যাপস নিষিদ্ধও করেনি। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র ‘না’ ভোটটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন প্রতিনিধি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে একে একটি বৃহত্তর ‘আমূল মতাদর্শিক প্রকল্প’ এবং ‘জ্ঞানগত ন্যায়বিচার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বাস্তব আয়তনের কাছাকাছি মানচিত্র ব্যবহারের মতো একটি যৌক্তিক আহ্বানকে পরাশক্তিটি কেন এভাবে দেখল, তা বিশ্বজুড়ে বৈশ্বিক বৈষম্য ও ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতীকী রূপকেই সামনে আনে।

তবে এই বিষয়টিকে কেবল ‘পশ্চিম বনাম গ্লোবাল সাউথ’ বা ‘ধনী বনাম গরিব’—এমন সরলীকরণে ভাগ করলে বর্তমানের সব বাস্তবতা পরিষ্কার হয় না। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে স্থানীয় শাসক ও অভিজাতরা নিজেদের জনগণের ওপর নিপীড়ন ও দুর্নীতি চালিয়েছে। আফ্রিকান চিন্তাবিদ আশিল এমবেম্বে তাঁর ‘অন দ্য পোস্টকলোনি’ গ্রন্থে স্বাধীনতা-উত্তর আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব স্বৈরাচারী ক্ষমতার কাঠামোকে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। তাই মানচিত্রে আফ্রিকাকে বড় দেখালেই রাতারাতি কোনো খনিশ্রমিকের মজুরি বাড়বে না বা অভুক্তের পেট ভরবে না, কিন্তু এটি ‘দেখার অভ্যাস’ বদলে দেবে। দীর্ঘকাল ধরে অন্যের চোখে নিজেদের দেখা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব দৃষ্টিতে বিশ্বকে দেখার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াই এটি, যা মানুষের মনের ভেতরে এঁকে দেওয়া মনস্তাত্ত্বিক মানচিত্রটিকে মুছে ফেলতে সাহায্য করবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo