জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের পর এবার তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে বিএনপি। গত সোমবার নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করার পর থেকেই দলটি আসন্ন এই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নতুন করে কৌশল সাজাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই নির্বাচনকে বিএনপির জন্য 'ছোট ভোটে বড় পরীক্ষা' হিসেবে অভিহিত করছেন।
দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিটি এলাকায় একক প্রার্থী নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে সম্ভাব্য প্রার্থীর আধিক্য, স্থানীয় নেতাদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ, কমিটি পুনর্গঠনজনিত জটিলতা এবং তৃণমূলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সামলানোর মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলো সামনে এসেছে। আগামী ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য চারটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে: পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, জনসমর্থন, দলের প্রতি অবদান ও ত্যাগ এবং নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা। এই মানদণ্ডগুলো মাঠপর্যায়ে কতটা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের প্রভাব বেশি থাকায় দলীয় ঐক্য ধরে রাখা জটিল হতে পারে।
নির্বাচনী প্রস্তুতি তদারকির জন্য দলের পক্ষ থেকে চার সদস্যের একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা। কমিটির সদস্যরা ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং অন্য বিভাগগুলোর নেতাদের সঙ্গেও বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে যাচাইয়ের পর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পৌঁছাবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দৈনিক এদিনকে জানান, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ায় গণমানুষের সঙ্গে প্রার্থীর সম্পৃক্ততা, স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের সমর্থন বিবেচনায় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে দলীয় প্রতীকের বাইরে নির্বাচন হওয়ায় স্বতন্ত্রভাবে একাধিক নেতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভোট বিভক্তির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল অবশ্য জানিয়েছেন, কৌশলগত কারণে বিকল্প প্রার্থী রাখা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ, তবে মূল লক্ষ্য ঐকমত্যের ভিত্তিতে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা।
সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও এক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, কারণ বিএনপির ৮২টি জেলা ও মহানগর কমিটির মধ্যে ৭২টিরই মেয়াদ শেষ হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর ইউনিটের সদস্যসচিব নজিমুর রহমান জানান, স্থানীয় পর্যায়ের মতামত নিয়ে গোপন প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই প্রার্থী চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত রবিবার সংসদীয় দলের বৈঠকে তারেক রহমান তৃণমূল থেকে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশনা দিয়েছেন এবং চাঁদাবাজ ও ভূমি দখলকারীদের মনোনয়ন না দেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানান, দলীয় চেয়ারম্যানের এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন দলের জন্য বড় পরীক্ষা। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্রীয় এই নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং মনোনয়নবঞ্চিতদের সামলে দল ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে কি না।





