ক্ষমা না চাইলেও একাত্তরের অবস্থান পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছে জামায়াত: আইনমন্ত্রী

Published: September 18, 2026, 9:22 am

১৯৭১ সালের অপরাধের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা না চাইলেও পরোক্ষভাবে একাত্তরের অবস্থান মেনে নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। শুক্রবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে বইটির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক তার বইয়ে দলটিকে ১৯৭১ সালের কর্মকাণ্ডের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানোর বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এই প্রসঙ্গের সূত্র ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, ইসলামিক শাসন জোর করে চাপিয়ে দেওয়া একটি ভ্রান্ত নীতি বা ফ্যালাসি। বরং সমাজ থেকে ইসলামিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠিত ও পরিচালিত হওয়াটাই প্রকৃত ইসলামিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের সঠিক পথ। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের বইয়েও বিষয়টি এভাবেই এসেছে। আইনমন্ত্রী জানান, তিনি রাজ্জাক সাহেবের ইসলামিক রাষ্ট্র চিন্তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারলেও, মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জায়গা থেকে এটি আইনবিদদের জন্য একটি ভালো প্রয়াস। বইটিকে কোনো সাধারণ সাহিত্য বা স্রেফ গবেষণা মনে না হয়ে, একজন মানুষের জীবন দর্শনের জীবন্ত বিশ্বকোষ বা এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো মনে হয়েছে তাঁর কাছে।

অনুষ্ঠানে জামায়াতের মূলধারার আইনজীবী ও বর্তমান নেতৃত্বের অনুপস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বা আমাদের অঙ্গনে জামায়াতের যেসব পরিচিত আইনজীবী বা নেতৃত্ব রয়েছেন, এই আলোচনায় তাদের উপস্থিত থাকার প্রত্যাশা ছিল। তাদের অনুপস্থিতিকে তাদের দীনতা, ব্যর্থতা, সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, তারা উপস্থিত হয়ে এই বইয়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারতেন, কারণ এটাই গণতন্ত্র। রাজ্জাক সাহেবের সব কথার সঙ্গে একমত হওয়া যেমন জরুরি নয়, তেমনি তাঁর সমালোচনা গ্রহণ করতে না পারাটাও সঠিক নয়। এই বইয়ে বিএনপিরও সমালোচনা করা হয়েছে এবং তা সবাইকে গ্রহণ করতে হবে।

আইনমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, ২০১৬ সালে ব্যারিস্টার রাজ্জাক একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকাকে জাতির সামনে তুলে ধরে যে স্টেটমেন্টের খসড়া করেছিলেন, জামায়াত যদি তখন তাতে সই করত, তবে দলটির অনেক প্রশ্নের সমাধান হতো। বর্তমানে জামায়াত সেই অবস্থানই মেনে নিয়েছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন ২০২২-এ মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞায় ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২৫ সালের সংশোধনী এবং ২০২৬ সালে এটি যখন সংসদে আইন হিসেবে পাসের জন্য বিশেষ কমিটিতে আসে, তখন জামায়াতের পক্ষ থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়ার দাবি জানানো হয়। ঐতিহাসিক সত্য অস্বীকার করা যায় না বিধায় আলোচনার পর আইনে ‘তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী’, ‘তৎকালীন মুসলিম লীগ’ ও ‘তৎকালীন নেজামে ইসলাম’ শব্দগুলো যুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে সংসদে এই আইন পাসের সময় জামায়াতের কোনো সদস্য ‘না’ vote বা ভোট দেননি। সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে ‘না’ ভোট না দেওয়ার মাধ্যমে জামায়াত পরোক্ষভাবে একাত্তরের সেই ভূমিকাকে মেনে নিয়েছে এবং এখানেই রাজ্জাক সাহেবের দূরদর্শিতা প্রকাশ পেয়েছে।

প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্যানেলিস্ট হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ, ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক রাইট টু ফ্রিডম-এর প্রেসিডেন্ট ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এবং দ্য ডেইলি স্টার-এর কনসালটিং এডিটর ও বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত মিডিয়া রিফর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin