বর্ণবাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নির্ভীক কণ্ঠযোদ্ধা নাভি পিল্লেই

Published: October 9, 2026, 12:19 pm

কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে কখনো পিছিয়ে যাননি নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লেই। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের দিনগুলো থেকে শুরু করে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন—তার দীর্ঘ কর্মজীবনের কেন্দ্রে সবসময় একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খেয়েছে, ক্ষমতাবানদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইন আসলে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে? যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত অনলাইন সাময়িকী ‘লাকুনা ম্যাগাজিন’-এর জন্য অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও লেখক রেবেকা ওমোনিরা-ওয়েকানমি নাভি পিল্লেইর একটি সাক্ষাৎকারভিত্তিক বিশেষ লেখা তৈরি করেছিলেন, যা ২০১৬ সালের ১ নভেম্বর প্রকাশিত হয়।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে ছয় বছর দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন দেশের সরকারকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি করার চেষ্টা করেছেন পিল্লেই। শ্রীলঙ্কার দীর্ঘ ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধ ২০০৯ সালে শেষ হওয়ার পর, সংঘাতের শেষ পর্যায়ে এক লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে ব্যর্থতার অভিযোগে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন তিনি। এই সমালোচনার জবাবে শ্রীলঙ্কা সরকার দাবি করেছিল, ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত হওয়ায় পিল্লেইর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শুধু শ্রীলঙ্কা নয়, ভারতে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার পর এক ভারতীয় কূটনীতিক অভিযোগ করেছিলেন যে পিল্লেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন। এমনকি সিরিয়ার এক রাষ্ট্রদূত তাকে ‘উন্মাদ’ বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন।

মানবাধিকার রক্ষায় পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বিমুখী নীতি ও ব্যর্থতা তুলে ধরেও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল পিল্লেইকে। যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ তার বক্তব্যে আপত্তি জানিয়ে বলেছিল, হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে—এমন দূরবর্তী উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকেই কেবল তার মনোযোগ দেওয়া উচিত। তবে এসব বৈরী অভিজ্ঞতা ও সমালোচনার কথা বলতে গিয়ে পিল্লেইর কণ্ঠে কোনো অভিযোগের সুর শোনা যায় না, বরং এক ধরনের বিস্ময় খেলা করে। তিনি হেসে স্মরণ করেন, ‘আমাকে অনেক খারাপ নামে ডাকা হয়েছে, এটা সত্যি। একবার কেউ আমাকে গুগুলে নিজের ছবি দেখতে বলেছিলেন। সেখানে অনেক ছবিতে আমার মুখের ওপর ওসামা বিন লাদেনের মুখ বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আসলে মানবাধিকার সম্পর্কে অনেকেরই কোনো সঠিক ধারণা নেই।’

পিল্লেইর জীবনের লড়াইয়ের ইতিহাস অবশ্য অনেক পুরোনো। ১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া পিল্লেইর শৈশব কেটেছে চরম বৈষম্যের মধ্য দিয়ে। তার দাদা ভারত থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় এসে চিনিকল ও আখের খামারে প্রায় দাসত্বের মতো পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। নারী, ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান—এই পরিচয়গুলো বর্ণবৈষম্যের শাসনে তার সামনে একের পর এক বাধা তৈরি করেছিল। শৈশবের অনেক বান্ধবী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরই পড়াশোনা ছেড়ে অল্প বয়সে বিয়ে করতে বাধ্য হলেও পিল্লেইর বাবা-মা চেয়েছিলেন মেয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাক।

সে সময়ে অশ্বেতাঙ্গদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া মোটেও সহজ ছিল না। ক্লেয়ারউডের দরিদ্র সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে স্কুলের প্রধান শিক্ষক যখন পিল্লেইর মেধার কথা তুলে ধরে বলেন যে মেয়েটির বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া উচিত, তখন এলাকার মানুষ নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে তার পড়াশোনার খরচ জোগাড় করেছিলেন। এই সহযোগিতাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও বৈষম্য তার পিছু ছাড়েনি। ক্লাসের সময়সূচি এমনভাবে নির্ধারণ করা হতো, যাতে আইনজীবীদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করা শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীদের সুবিধা হয়। ভোরে ও রাতে ক্লাস করতে হতো পিল্লেইকে, আর মাঝখানের সময়ে বাড়ি ফেরার বাসভাড়া না থাকায় লাইব্রেরিতে বসে তিনি নুরেমবার্গ বিচারের নথিপত্র পড়তেন।

আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন ১০-১১ বছর বয়সেই এক শিক্ষককে জানিয়েছিলেন পিল্লেই। তখন ওই শিক্ষক তাকে বলেছিলেন, আইন পড়তে হলে ধনী বাবা থাকতে হবে; এ পড়াশোনায় অনেক টাকা লাগে। তার বাবা ছিলেন একজন সাধারণ বাসচালক। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে চাকরি খুঁজতে গিয়েও তিনি বর্ণবাদের মুখোমুখি হন। শ্বেতাঙ্গদের নিয়ন্ত্রিত একটি প্রতিষ্ঠান তাকে সরাসরি জানিয়ে দেয়, কোনো শ্বেতাঙ্গ সচিব একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির নির্দেশ মেনে কাজ করবে—এমন পরিস্থিতি তারা চায় না। কোথাও তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল তার বাবা ব্যবসায়ী কি না, আবার সদ্য বিবাহিত হওয়ায় সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়লে কী হবে—এমন অপমানজনক প্রশ্নেরও মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে।

কোনো উপায় না দেখে পিল্লেই নিজের আইনজীবী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন, যা তার পুরুষ সহকর্মীরা ঔদ্ধত্য হিসেবে দেখেছিলেন। ধীরে ধীরে পারিবারিক সহিংসতার মামলায় দক্ষতা অর্জন করার পাশাপাশি তিনি বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের পক্ষে আইনি লড়াই শুরু করেন। তার মক্কেলদের মধ্যে ছিলেন তার নিজের স্বামী গ্যাবি পিল্লেইও। রবেন দ্বীপের কারাগারে বন্দীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তারা যাতে আইনজীবীর সহায়তা ও ন্যায়সংগত বিচারের সুযোগ পান, সে জন্য লড়াই করেন তিনি। এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই তিনি উপলব্ধি করেন, দেশের আইনব্যবস্থার ভেতরেই যখন অন্যায় গেঁথে থাকে, তখন নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

বর্ণবৈষম্যের শাসনামলে নিজের গায়ের রঙের কারণে একসময় যে বিচারকের কক্ষে প্রবেশের অধিকারও পিল্লেইর ছিল না, ১৯৯৫ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা তাকে দক্ষিণ আফ্রিকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। দেশটির প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হয়ে ইতিহাস গড়া পিল্লেইর জন্য বিচারকের কক্ষে তার প্রথম প্রবেশটি ছিল মূলত নিজের কক্ষে প্রবেশ। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রে পরিবর্তন আনা কঠিন হতে পারে, কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচনালগ্নে সেই পরিবর্তনের ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin