শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে এখন দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। বরিশালের বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিক এবং মহিষাসুরের প্রতিমা তৈরিতে চলছে খড় ও মাটির প্রলেপ এবং রং-তুলির কাজ। তবে উৎসবের আমেজ থাকলেও প্রতিমা তৈরির উপকরণের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শিল্পীরা। উৎপাদন খরচ বাড়লেও পূজা কমিটিগুলোর বাজেট না বাড়ায় এখন লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। অনেকে টিকে থাকার তাগিদে নিজেদের দৈনন্দিন ও খাবারের খরচ কমিয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন।
ফরিদপুরের ভাঙ্গার মৃৎশিল্পী কার্তিক চন্দ্র পাল এবার বরিশালের শ্রীশ্রী শংকর মঠে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। গত বছরের তুলনায় এবার তিনি কম প্রতিমার কাজ হাতে নিয়েছেন, সব মিলিয়ে তৈরি করছেন ১২টি প্রতিমা। এর মধ্যে বরিশাল নগরে পাঁচটি এবং বাবুগঞ্জের মাধবপাশায় একটি প্রতিমা রয়েছে। কার্তিক চন্দ্র পাল জানান, গত বছর ৩৫০ টাকায় কেনা মাটির বস্তা এবার ৫০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এছাড়া পাটের দাম ১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ২২০ টাকা, ৬০০ টাকার খড়ের নাড়া ১১০০ টাকা এবং চটের দাম ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা হয়েছে। বাঁশসহ অন্যান্য উপকরণের দামও চড়া। পাঁচজন শ্রমিক নিয়ে কাজ করা এই শিল্পী বলেন, একটি প্রতিমা তৈরিতে এক লাখ টাকা পাওয়া গেলে তার মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার টাকাই নির্মাণকাজে চলে যায়। বাকি টাকা যাতায়াত, শ্রমিক ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ে শেষ হয়ে যাওয়ায় লাভ থাকে খুবই সামান্য।
একই ধরনের সংকটের কথা তুলে ধরেন কার্তিক পালের বড় ভাই রণজিৎ পাল। তিনি বলেন, খরচ বাড়লেও পূজা কমিটিগুলো বাজেট বাড়ায়নি। ফলে নির্ধারিত বাজেটে কাজ শেষ করতে গিয়ে অনেক সময় একবেলা বা দুইবেলা খেয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কেবল পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতেই তারা এই পেশা আঁকড়ে আছেন। বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠির মৃৎশিল্পী যোগেশ পালও জানান, প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই পেশা টিকিয়ে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এখন আর আগের মতো লাভ নেই, যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালানোই দায়।
মৃৎশিল্পীদের এই কঠিন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চারুকলা বরিশালের সাবেক সভাপতি সুশান্ত ঘোষ। তিনি জানান, প্রতিমাশিল্পীদের উৎসাহিত করতে প্রতিবছরের মতো এবারও দুর্গাপূজার ষষ্ঠী ও সপ্তমীতে মৃৎশিল্পী প্রদর্শনী ও সম্মাননার আয়োজন করা হয়েছে।
এদিকে, বরিশাল জেলা ও মহানগর মিলিয়ে এবার মোট ৬৩৭টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে, যা গত বছরের চেয়ে একটি বেশি। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় ৫৯০টি এবং মহানগর এলাকায় ৪৭টি মণ্ডপ রয়েছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভাগীয় কমিশনার, police কমিশনার, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একাধিক প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বরিশাল মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গোপাল চন্দ্র সাহা জানান, বিভিন্ন মন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে এবং প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মানিক মুখার্জী কুডু জানান, মণ্ডপের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি প্রতিটি মণ্ডপে নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক সক্রিয় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।





