বগুড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবার ও সামাজিক নজরদারির অভাবকে পুঁজি করে অল্প বয়সেই সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে জেলায় মোট ৩৯টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন বর্তমানে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার, জমি দখল, প্রতিপক্ষের ওপর হামলা এবং ইভটিজিংয়ের মতো নানা অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। শহরের অলিগলিতে দামী ফোনের প্রদর্শন এবং মোটরসাইকেলে বেপরোয়া মহড়া দিয়ে তারা জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, বগুড়া শহরে অন্তত ১৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যাদের নেতৃত্বে রয়েছেন ৪০ থেকে ৫০ জন চিহ্নিত ব্যক্তি। এদের বিরুদ্ধে হত্যা ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক তদারকির অভাব, সামাজিক অবক্ষয়, আইনের কঠোর প্রয়োগের ঘাটতি এবং বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে এই গ্যাংগুলোর বিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সুযোগ নিয়ে আইনের ফাঁক গলে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং মূল সন্ত্রাসীরা তাদের ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও অপরাধচক্রের পৃষ্ঠপোষকতায় গ্যাং সদস্যরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। কোনো সদস্য গ্রেপ্তার হলে পৃষ্ঠপোষকরা জামিন ও কারাগারে বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করায় তারা দ্রুত অপরাধে ফিরে আসছে।
পুলিশ ও স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, জলেশ্বরীতলা, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, পুরোনো শিল্পকলা একাডেমি, মহিলা ক্লাব, মুক্তির ফুলবাড়ী, সেউজগাড়ী রেল কলোনি বধ্যভূমি, সুবিল ব্রিজ, ফুলবাড়ী নদীর ঘাট, উপশহর, কলোনি, মালতীনগর স্টাফ কোয়ার্টার এবং রহমাননগরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে বগুড়ায় ৫৩০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই ৩৯টি খুনের ঘটনা ঘটে এবং একই সময়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অন্তত ১০০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত এসব ঘটনায় ২৩৯টির বেশি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে, তবে গ্যাংগুলোর প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
গত মে মাসে নিজ বাসার পার্কিংয়ে ব্যবসায়ী ফারান তানভীর ছুরিকাঘাতের শিকার হন। ১৭ এপ্রিল শাকপালা পার্কে সংঘর্ষের জেরে স্কুলশিক্ষার্থী সামিউল সিয়ামকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। এর আগে ২০২৫ সালে কালীতলা মোড়ে দায়িত্বরত এসআই আব্দুর রহমান ও এএসআই আহম্মদ আলীকে গ্যাং সদস্যরা কুপিয়ে জখম করে। এছাড়া ২০২০ সালে জলেশ্বরীতলায় রশিদুল ইসলামকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
কিশোর অপরাধ দমনে এসআরবি-১২ ও জেলা পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। চলতি বছরের আগস্টে শাজাহানপুরের শাবরুল এলাকায় ‘জালাল গ্রুপ’-এর ১১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে সর্বকনিষ্ঠের বয়স ছিল ১৪ বছর। তাদের কাছ থেকে চাপাতি, বার্মিজ চাকু, বল্লম ও মাদক উদ্ধার করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশ আউলিয়া, রাহাত ও সিফাতসহ অনেককে গ্রেপ্তার করেছে।
বগুড়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) রাইয়ান আলম জানান, কিশোর অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে এবং পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত ৫ অক্টোবর জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে কমিউনিটি পুলিশের সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পুলিশ কর্মকর্তারা অপরাধ দমনে বিশেষ নজরদারি ও ধারাবাহিক অভিযানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের সম্পাদক কেজিএম ফারুকের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের চিহ্নিত করা সম্ভব হলে অপরাধের হার কমানো যাবে।
গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, বগুড়া শহরে অন্তত ১৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্যাংয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন ৪০-৫০ জন চিহ্নিত ব্যক্তি। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালে গাবতলীর পীরগাছায় একটি পিকনিকের বাসে তল্লাশি চালিয়ে বার্মিজ চাকুসহ ৯ কিশোরকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। অভিযানে দেশীয় অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়।





