ড্রোন হামলা ঠেকাতে পাকিস্তানের পুলিশ চেকপোস্টে মাছ ধরার জাল

Published: October 7, 2026, 6:45 am

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার হামলা মোকাবিলায় পুলিশ কর্তৃপক্ষ এক অভিনব ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কাতারভিত্তিক বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন পুলিশ চেকপোস্টের ওপর কয়েক মিটার উঁচুতে মাছ ধরার জাল টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। দড়ি ও তার দিয়ে জোড়া দেওয়া এসব জাল দেখতে অনেকটা আকাশের ওপর তৈরি করা ছাদের মতো।

এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে ১৬ এপ্রিল হাঙ্গু জেলার সারকি পিয়ালা পুলিশ চেকপোস্টে পাকিস্তান তালেবান বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর ভয়াবহ ড্রোন ও স্থল হামলার ঘটনা। প্রায় সাত ঘণ্টা স্থায়ী ওই সংঘর্ষে একটি সাঁজোয়া যানের চালক নিহত এবং এক পুলিশ সদস্য আহত হন। পুলিশ পরিদর্শক ফাইয়াজ খান জানান, সে সময় তারা চরম আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন এবং বেঁচে বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়েও নিশ্চিত ছিলেন না। এই ঘটনার পর প্রায় দুই মাস আগে চেকপোস্টটিতে জাল বসানো হয় এবং এরপর থেকে সেখানে আর কোনো ড্রোন হামলা হয়নি।

পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, কোনো ড্রোন চেকপোস্টের ওপর দিয়ে উড়ে এলে তা জালে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা ড্রোনটিকে নিষ্ক্রিয় করতে বা থামাতে সাহায্য করতে পারে। এছাড়া ড্রোনটি জালে না আটকে ওপরেই বিস্ফোরিত হলেও জালের কারণে বিস্ফোরণের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে এবং নিচে থাকা পুলিশ সদস্যদের ওপর সরাসরি আঘাতের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। হাঙ্গু জেলার পুলিশ কর্মকর্তা তারিক হাবিব জানান, একটি সাধারণ পুলিশ চেকপোস্ট ঢাকতে এ ধরনের জাল বসাতে প্রায় ৪ লাখ পাকিস্তানি রুপি বা প্রায় ১ হাজার ৪৩৫ ডলার খরচ হয়। বর্তমানে হাঙ্গু ছাড়াও কোহাট, কারাক, বান্নু, লাক্কি মারওয়াত ও ডেরা ইসমাইল খানের অন্তত পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এমনকি প্রদেশের কিছু সামরিক ঘাঁটিতেও অ্যান্টি-ড্রোন জাল ব্যবহার করা হচ্ছে। কর্মসূচিটি আরও সম্প্রসারণের জন্য প্রাদেশিক সরকারের কাছে অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া হয়েছে, যা বর্তমানে পর্যালোচনাধীন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে সশস্ত্র হামলা বেড়েছে, যার প্রধান লক্ষ্য পুলিশ ও সামরিক বাহিনী। হাঙ্গুতে গত ২৯ জুলাই বোমা বহনকারী কোয়াডকপ্টার দিয়ে হামলার পর স্থলপথে আক্রমণ চালানো হয়, যাতে অন্তত ১১ পুলিশ সদস্য নিহত ও ২৮ জন আহত হন। এছাড়া ২০ সেপ্টেম্বর হাঙ্গুতে আরেকটি বন্দুকযুদ্ধে ছয় সেনা ও আট হামলাকারী নিহত হয় এবং তার দুই দিন আগে কোহাট জেলায় সমন্বিত হামলায় ১৬ পুলিশ সদস্যসহ ২৩ জন নিহত হন। চলতি বছরে হাঙ্গুতে অন্তত ১৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ গুল সতর্ক করে বলেছেন, এটি পুলিশের মধ্যে নিরাপত্তার ‘ভুল ধারণা’ তৈরি করতে পারে। পেশোয়ারভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফিদা আদিল জানান, মাছ ধরার জালের ধারণাটি সামরিক বাহিনীর ছদ্মবেশী জাল থেকে অনুপ্রাণিত এবং ইউক্রেনেও রুশ ড্রোন প্রতিহত করতে অনুরূপ কৌশল ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিস্ফোরকবাহী ড্রোনের বিরুদ্ধে এটি কতটা কার্যকর হবে তা জালের নকশা ও স্থাপনের ওপর নির্ভরশীল এবং বাস্তব পরীক্ষা ছাড়া ক্ষয়ক্ষতি কমানোর দাবি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

খাইবার পাখতুনখাওয়া পুলিশের মুখপাত্র আবদুস সালাম খালিদ অবশ্য জানান, কোহাটে জাল ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা চালানো হয়েছে, যেখানে বিস্ফোরক ফেলা হলেও সেটি বিস্ফোরিত হয়নি। পুলিশ পরিদর্শক ফাইয়াজ খান স্বীকার করেন যে এই জাল পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, তবে এটি দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের জন্য কিছুটা নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করছে। তিনি বলেন, তারা হামলার জন্য প্রস্তুত থাকেন এবং দেশের সুরক্ষায় চূড়ান্ত ত্যাগ স্বীকার করতেও পিছপা হবেন না।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Dainik Amader Shomoy