বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যখন এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে ঢাকায় ভারতীয় নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। গত ১২ জুন কলকাতা থেকে সড়কপথে ঢাকা আসার পর ২৫ জুন রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশ করে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকে এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ যে পরিমাণ কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ করছেন, তা অতীতে ঢাকায় কর্মরত কোনো কূটনীতিকের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। দায়িত্ব গ্রহণের পর দুই মাসের ব্যবধানে তিনি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ অন্তত ২৮ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
ভারতীয় দূতের এই ধারাবাহিক বৈঠকের তালিকায় পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, অর্থ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, বাণিজ্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার, এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলো রয়েছে। তার আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারতীয় প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু করা, মৈত্রী এক্সপ্রেস পুনরায় চালু করা, সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে যৌথ মহড়া ও প্রশিক্ষণ বিনিময়, আমলাদের প্রশিক্ষণের জন্য দিল্লিতে পাঠানো এবং বাংলাদেশ-ভারত সংসদীয় ককার্স গঠন। এসব ইস্যুতে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন।
সবকিছুকে ছাপিয়ে বর্তমানে আলোচিত ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর। দীনেশ ত্রিবেদী তার দেশের পক্ষ থেকে এই সফরের গুরুত্ব বারবার তুলে ধরছেন। গত ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সচিবালয়ের দপ্তরে সাক্ষাতের সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীকে তার পরিবারসহ দিল্লিতে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানান। এ সময় তিনি একান্তে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন এবং বৈঠকের পর সাংবাদিকদের জানান, দুই প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে বসলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তবে ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই সফরের জন্য একটি অনুকূল ও সহায়ক পরিবেশ প্রয়োজন, আর তা তৈরির দায়িত্ব ভারতের।
ভারতীয় দূতের এই তৎপরতা নিয়ে নানা মহলে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। গত ৫ আগস্ট পলাতক শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখার বিষয়টি নিয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর ভারতীয় হাইকমিশনারকে সাফ জানিয়ে দেন, দিল্লির উচিত নিশ্চিত করা যেন ভারতের মাটি ব্যবহার করে কেউ বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে না পারে। এর প্রেক্ষিতে ত্রিবেদী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর রাতেই তিনি দিল্লি গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি ব্রিফ করেন।
বৈঠকগুলোতে অধিকাংশ মন্ত্রী ও উপদেষ্টা বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে জোরালো অবস্থান নিলেও ভারতীয় হাইকমিশনার তার এজেন্ডা বাস্তবায়নে অবিচল। তিনি বরাবরই বলে আসছেন, তার কাজ হলো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া। তিনি বিশ্বাস করেন, দুই দেশের জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সম্পর্কের একটি সোনালি অধ্যায় শুরু হবে। তবে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিসহ কয়েকজন নীতিনির্ধারক সীমান্ত হত্যা এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা নিয়ে তাদের ক্ষোভের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
সবশেষ ৩০ সেপ্টেম্বর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সঙ্গে বৈঠকের পর ভারতীয় দূত পুনরায় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সঠিক সময়ে ভারত সফরে যাবেন। তিনি দাবি করেন, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ থাকলেও সবকিছু সঠিক পথেই রয়েছে। সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বললেও, তার এই অতি সক্রিয়তা নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন ও কৌতুহল অব্যাহত রয়েছে।





