ভয় পেয়ে গুটিয়ে গেলে এমন ঘটনা বারবার ঘটবে: ইউপিএল এমডি মাহ্‌রুখ মহিউদ্দীন

Published: October 4, 2026, 9:11 am

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি বিক্রি করার কারণে রাজধানীর বাংলাবাজারে দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করতে বাধ্য করার ঘটনা ঘটেছিল। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এবং ইউপিএলের বর্তমান অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন প্রকাশনা সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহ্‌রুখ মহিউদ্দীন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, সমাজে অপছন্দের বই, সংস্কৃতি ও মতাদর্শেরও টিকে থাকার অধিকার রয়েছে। এই অধিকার রক্ষায় উদ্যোগী না হয়ে ভয় পেয়ে গুটিয়ে গেলে এমন ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর (সোমবার) ইউপিএলের বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে হামলা চালানো হয় এবং কর্মীদের হেনস্তা করে কয়েক ঘণ্টা ফাঁড়িতে আটকে রাখা হয়েছিল। ইউপিএলের শোরুমে হামলা ও বিক্রয়কর্মীদের হয়রানির ৩৬ ঘণ্টা পর এবং আইনি প্রস্তুতি ও কর্মীসংকটের কারণে মাত্র একদিন বিক্রয়কেন্দ্রটি বন্ধ রাখা হয়েছিল। এরপর গত বুধবার সকাল থেকে সেটি পুরোদমে খোলা রয়েছে এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে। ইউপিএলের ফেসবুক পেজে বিক্রয়কেন্দ্র খোলার তথ্য জানানোর পর পাঠকদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া মিলেছে।

আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে মাহ্‌রুখ মহিউদ্দীন জানান, থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও পুলিশ এখনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে তা নথিভুক্ত করেনি। তবে তাঁরা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করছেন এবং আইনি প্রতিকার পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চও (এসবি) সিসিটিভি ফুটেজ চেয়েছে এবং ইউপিএল তা সরবরাহ করেছে। তিনি মনে করেন, ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিজেই বাদীপক্ষ হওয়া উচিত, কারণ এখানে শুধু আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং রাষ্ট্র ও আইনকেও আক্রমণ করা হয়েছে। তাই অপরাধীদের খুঁজে বের করা এবং এর পেছনে কারও ইন্ধন রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরও রয়েছে।

সরকার বা পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো চাপ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ঘটনার শুরু থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সহযোগিতা পাওয়া গেছে। কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ তাঁরা অনুভব করেননি। থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে ঘটনাটি যে পরিকল্পিত ছিল, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মাহ্‌রুখ মহিউদ্দীন বলেন, ইউপিএল সবসময় চাপের মুখে নতি স্বীকার না করার নীতি বজায় রেখেছে। এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে পাঠক সমাজ, গণমাধ্যম ও সচেতন মানুষের যে বিপুল সমর্থন পাওয়া গেছে, তা ইন্ধনদাতারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন।

এর আগেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বইমেলায় ইউপিএল অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। সেখানে কিছু অতিউৎসাহী তরুণ এস এ করিমের ‘শেখ মুজিব: ট্রায়াম্ফ অ্যান্ড ট্র্যাজেডি’ এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের ‘বাংলাদেশ: শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল’ বই দুটি প্রদর্শনে আপত্তি জানিয়েছিল। অথচ মওদুদ আহমদের বইটি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের আমল নিয়ে একটি বহুল প্রশংসিত সমালোচনামূলক গ্রন্থ। মাহ্‌রুখ মহিউদ্দীন বলেন, ‘অন্যদিকে, আমার অপছন্দের বই, সংস্কৃতি ও মতাদর্শেরও যে সমাজে থাকার অধিকার আছে, সেটা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেওয়া এবং এই অধিকার লঙ্ঘনের যেকোনো তৎপরতা থামাতে উদ্যোগ না নিলে যাঁরা এসব ঘটনার জন্য দায়ী, তাঁরা নিজেরাই একদিন এসব পরিস্থিতির শিকার যে হবেন না, এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।’

ইউপিএলের বই প্রকাশের মূলনীতি সম্পর্কে তিনি জানান, ‘কাজেই যা কিছু আমরা প্রকাশ করি, তা কয়েকটি মূলনীতির ভিত্তিতে—১. পাণ্ডুলিপির মৌলিকত্ব ও উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্তের সঠিকতা, ২. লেখকের গুরুত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা, ৪. টার্গেট বা উদ্দিষ্ট পাঠকের জন্য কাজটির গুরুত্ব।’ অনেক সময় ব্যবসায়িক সাফল্য কম হতে পারে জেনেও দেশের ইতিহাস ও জ্ঞান সংরক্ষণের তাদিগে বই প্রকাশ করা হয়। এই নীতির কারণে অতীতেও ইউপিএলকে ক্ষমতাসীনদের বিরাগভাজন হতে হয়েছে এবং ব্যবসায়িক ক্ষতি সইতে হয়েছে, কিন্তু তারা কখনো নীতি থেকে সরেনি। বর্তমান পরিস্থিতিতেও তারা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বা মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের বিশেষ প্রচার অব্যাহত রেখেছে।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটির প্রামাণিকতা নিয়ে ওঠা সন্দেহের জবাবে মাহ্‌রুখ মহিউদ্দীন বলেন, পাণ্ডুলিপির সত্যতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করেই এটি প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রকাশক ইমেরিটাস মহিউদ্দিন আহমেদ এবং প্রকাশনা উপদেষ্টা বদিউদ্দিন নাজির এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। এছাড়া পেঙ্গুইন ও অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের মতো আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাও নিজস্ব প্রক্রিয়ায় যাচাই করে এর অনুবাদ প্রকাশ করেছে। তিনি আরও বলেন, এই বইয়ে শেখ মুজিব পাকিস্তানের যৌক্তিকতা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার যেসব কারণ উল্লেখ করেছেন, তা প্রচলিত জাতীয়তাবাদী ন্যারেটিভকে ভেঙে দেয়। তাই যারা এর সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন, তাঁদের বই পড়ার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

সরকারি বই ক্রয়ের সঙ্গে এই হামলার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখবে বলে মাহ্‌রুখ মহিউদ্দীন মনে করেন। তবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্প্রতি সরকারের একটি বড় বই ক্রয়ে ইউপিএলসহ অনেক নামজাদা প্রকাশনীর একটি বইও স্থান পায়নি। এমন অস্বচ্ছ ক্রয়নীতি দেশের প্রকাশনা শিল্পের জন্য হতাশাজনক। ইউপিএলকে একটি জাতীয় সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত ৫০ বছরে দেশের একাডেমিক ও গবেষণামূলক বইয়ের সিংহভাগ ইউপিএল প্রকাশ করেছে। তাই এই প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য সবার উদ্যোগী ভূমিকা নেওয়া উচিত। দীর্ঘ ২০ বছর আগে বিদেশ ছেড়ে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত এবং বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই অভিজ্ঞতা ও চাপ জীবনকে সমৃদ্ধ করে এবং ব্যক্তিত্বের পরীক্ষা নেয়, যা তাঁর জীবনের বড় সঞ্চয়।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo