পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আগামী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপের অংশ হিসেবে সম্প্রতি প্রথম ইউনিটের নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এরপর আরও উচ্চ চাপে আরেকটি পরীক্ষা চালানো হবে। মূলত চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিভাজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে গত সেপ্টেম্বরেই তাপ উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা ছিল। তবে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় এই প্রক্রিয়া কিছুটা পিছিয়ে যায়।
পরীক্ষায় নিয়ন্ত্রণ ভালভগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাই করা হয়েছে। পরীক্ষা শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অগ্নিনিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয়তা-সংক্রান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও পর্যবেক্ষণ করেন। বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান ও জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে যৌথভাবে এই পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়। এ সময় প্রথম ইউনিটের চাপ নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত চাপ কমানো, ভালভ খোলা ও বন্ধের সময়, সতর্কসংকেত এবং প্রয়োজনীয় চাপ ও তাপমাত্রার তথ্য নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ১৬ মেগাপ্যাসকেল চাপের এই পরীক্ষাটি সফলভাবে শেষ হওয়ার পর এখন ১৮ মেগাপ্যাসকেল চাপে পরবর্তী পরীক্ষাটি করার প্রস্তুতি চলছে।
এই পরীক্ষার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম জানান, মেগাপ্যাসকেল হলো চাপের পরিমাপক। পারমাণবিক চুল্লিপাত্রে স্বাভাবিক চাপ থাকে ১৬ মেগাপ্যাসকেল, যা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া মানে কেন্দ্রটি চালু করা সম্ভব। তবে আরও উচ্চ চাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য ১৮ মেগাপ্যাসকেলের পরীক্ষাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা অবাস্তব নয় এবং এটি অর্জন করা সম্ভব।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, চূড়ান্ত ধাপের আরও কয়েকটি পরীক্ষা বাকি রয়েছে, যা সম্পন্ন হলে তাপশক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ঘোরানো হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। সম্প্রতি পারমাণবিক জ্বালানি আসা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় তা নাকচ করে দিয়েছে। প্রথম ইউনিটের প্রয়োজনীয় সব জ্বালানি ২০২৩ সালেই দেশে এসে পৌঁছেছিল এবং গত মে মাসে তা চুল্লিপাত্রে প্রবেশ করানো শেষ হয়। সম্প্রতি প্রথম ইউনিটের জন্য অতিরিক্ত জ্বালানির একটি চালান দেশে আসে, যা সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় রূপপুরে পৌঁছায়। এছাড়া দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানিও প্রস্তুত রয়েছে এবং দ্রুতই এর প্রথম চালান দেশে পৌঁছাতে পারে। সব মিলিয়ে এই দফায় মোট ৯টি চালান আসার কথা রয়েছে।
দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরমাণু শক্তি কমিশন। এটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)। পাবনার রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, একটি ত্রুটির কারণে কাজ দুই মাস পিছিয়ে গেলেও এখন সব ঠিকঠাক এগোচ্ছে এবং জ্বালানি নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। প্রতি সপ্তাহে জ্বালানির চালান আসবে এবং অল্প কিছু পরীক্ষা শেষে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর পর তা টানা ৭-৮ মাস চলতে পারে। গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় জ্বালানি আসার পরই রূপপুর পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতি পায়। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিপাত্রে চলতি মাসের শেষ দিকে শক্তি উৎপাদন শুরু হতে পারে। এই শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা ধাপে ধাপে ৩০ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
রূপপুর প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও দুই দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্পের মূল খরচ বাড়ানোর সুযোগ নেই। তবে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের খরচ ২৬ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকায়।





