একের পর এক অবস্থান বদল ও বিতর্ক: কে এই মেজর আখতারুজ্জামান?

Published: October 4, 2026, 4:38 am

ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং দায়িত্বরত এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। গত ১ অক্টোবরের ওই ঘটনার সময় বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিবো’। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর গত শুক্রবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং শনিবার আদালত তাঁর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জামায়াতে ইসলামীর ৭১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বিদেশ সফর শেষে ফেরার দিনই বিমানবন্দরে এই কাণ্ড ঘটান তিনি। এই ঘটনার পর শুক্রবার রাতেই বিমানবন্দর পরিদর্শন করে যাত্রীদের সেবা বাড়ানোর নির্দেশ দেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।

১৯৫১ সালে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় জন্ম নেওয়া আখতারুজ্জামান (ডাকনাম রঞ্জন) ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের সময় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালেই দলটির সঙ্গে যুক্ত হওয়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধা কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তৎকালীন সময়ে আসনটি কেবল কটিয়াদী উপজেলা নিয়ে গঠিত ছিল, যা পরে পাকুন্দিয়া উপজেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। বিএনপির মনোনয়নে ২০১৮ (2018) সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে নির্বাচন করে হেরে যান আখতারুজ্জামান। একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করা আখতারুজ্জামান বরাবরই তাঁর নানা মন্তব্য ও দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য আলোচনায় ছিলেন।

রাজনৈতিক জীবনে মোট পাঁচবার বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন আখতারুজ্জামান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের সময় দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তিনি গণমাধ্যমে বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জনগণের এবং বিএনপির তা মেনে নেওয়া উচিত। এই বক্তব্যের জেরে তিনি প্রথমবার বহিষ্কৃত হন। এরপর ২০০০ সালে বিএনপির সংসদ বর্জনের সিদ্ধান্ত অমান্য করে অধিবেশনে যোগ দেওয়ায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয় এবং তিনি দ্বিতীয়বার বহিষ্কৃত হন। আখতারুজ্জামান এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গেলেও ২০০১ (2001) সালের জুলাই মাসে সপ্তম সংসদ (১৯৯১-৯৬) [1991-96] বিলুপ্ত হওয়ার আগপর্যন্ত তাঁর আসনটি শূন্যই ছিল। ২০১৪ সালে তারেক রহমানকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করায় তৃতীয়বার এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সমালোচনা করায় চতুর্থবার বহিষ্কৃত হন তিনি। প্রতিবারই পরে তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হলেও ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি একটি টক শোতে ‘বিএনপির লজ্জা-শরম নেই, কোনো ভিশন নেই’ মন্তব্য করায় এবং ‘নেতাদের কর্মীরা জুতাপেটা করবে’ বলে উল্লেখ করায় তাঁকে পঞ্চমবারের মতো বহিষ্কার করা হয়, যা আর প্রত্যাহার করা হয়নি।

বিএনপি থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত ‘ডামি’ নির্বাচনের আগে ২০২৩ সালের ৮ জুন গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন আখতারুজ্জামান। তাঁর ছেলে সাব্বির জামানের মালিকানাধীন ‘কিশোরগঞ্জ গ্রিন পাওয়ার’-এর পক্ষ থেকে ৭০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্টের অনুমতির আবেদন দিতেই তিনি সেখানে যান। ওই সাক্ষাতের পর শেখ হাসিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে আখতারুজ্জামান তাঁকে ‘দশভুজা দেবী’র সঙ্গে তুলনা করেন এবং তারেক রহমানের কড়া সমালোচনা শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ঘরে ঘুমিয়ে থাকলেও পাস করব, এটাই রাজনৈতিক বাস্তবতা’। তবে ওই নির্বাচনে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।

আখতারুজ্জামানের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় বৈপরীত্য দেখা গেছে জামায়াতে ইসলামী নিয়ে তাঁর অবস্থানে। ১৯৯১ সালে জামায়াতের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠনের বিরোধিতা করা আখতারুজ্জামান বিভিন্ন সময়ে দলটিকে ‘রাজাকার’, ‘যুদ্ধাপরাধী’ ও ‘রগ কাটার দল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এমনকি ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগেও তিনি নেতা-কর্মীদের জামায়াত থেকে সাবধান থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে এক টক শোতে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের সন্তান’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী’ বলে উত্তেজিত কণ্ঠে গালমন্দ করেন তিনি। অথচ, গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে দলটির আমির শফিকুর রহমানের হাত থেকে প্রাথমিক সহযোগী সদস্য ফরম পূরণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেন তিনি। এই ডিগবাজির বিষয়ে পরে তিনি দাবি করেন, জামায়াতের কার্যক্রমে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের বিরোধিতার পরও জামায়াত তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল কাদের।

বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টক শোতে নিয়মিত অংশ নেওয়া আখতারুজ্জামান বরাবরই আক্রমণাত্মক আচরণের জন্য বিতর্কিত। একবার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাহবুব কামালের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে তিনি ধমকের সুরে বলেন, ‘অভদ্রের মতো কথা বলেন কেন? আমাকে চ্যালেঞ্জ করেন কেন? এটা করবেন না।’ আরেকটি টক শোতে আমজনতার দলের সদস্যসচিব তারেক রহমানের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনার জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলা দরকার’ এবং ‘আপনার মতো লোক গুম হবে না তো কে হবে?’। এছাড়া চলতি বছরের মাঝামাঝি এক টক শোতে জবান ম্যাগাজিনের সম্পাদক রেজাউল করিম রনির সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে তিনি দাবি করেন, ১৬ ডিসেম্বরের আগপর্যন্ত জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও তারা কোনো গণহত্যা করেনি। এমন নানা বিতর্ক আর নাটকীয়তায় ঘেরা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান এখন বিমানবন্দর কাণ্ডে শ্রীঘরে রয়েছেন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo