কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় ১৩ বছরের স্কুলছাত্র অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ প্রশাসন। শুধু গ্রেপ্তার বা অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, দেশজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ লক্ষ্যে একটি সমন্বিত প্রস্তাবনা তৈরির জন্য পুলিশের একজন ডিআইজিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কিশোর অপরাধীদের বিদ্যমান তালিকা হালনাগাদ করার পাশাপাশি শিগগিরই দেশব্যাপী একটি সর্বাত্মক বা ‘অলআউট’ অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে কুমিল্লাসহ পাঁচটি জেলায় বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লাসহ পাঁচটি জেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক কিশোর ও তরুণকে আটক করা হয়েছে। কুমিল্লায় তিন দফায় মোট ১ হাজার ২৯৩ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে প্রথম দফায় ১৮টি থানায় অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়, যার মধ্যে ৪৫১ জনকে মুচলেকা দিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছাড়া হয় এবং ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দ্বিতীয় দফায় ২৫৪ জন এবং গত রবিবার রাতে তৃতীয় দফায় ৪১৫ জনকে আটক করা হয়। এছাড়া রবিবার রাতে চাঁদপুরের আটটি উপজেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩৭০ জনকে আটক করে পুলিশ, যাদের মধ্যে ৩৫৫ জনকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আটককৃতদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনলাইন জুয়া ও মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। একই দিন লক্ষ্মীপুরের ছয়টি থানায় অভিযান চালিয়ে ২৬৬ জনকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে ২১৪ জনকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। ফেনী শহরে অভিযান চালিয়ে ৩৮ জন এবং চট্টগ্রাম জেলার ১৭টি থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪৪৫ জনকে আটক করে পুলিশ।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের ধরন দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। চুরি, ছিনতাই বা মারামারির মতো সাধারণ অপরাধ দিয়ে শুরু হলেও এখন তারা জড়িয়ে পড়ছে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, অপহরণ, ডাকাতি, জমি দখল ও ভাড়ায় খাটার মতো গুরুতর অপরাধে। এমনকি তাদের কাছ থেকে দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে কুমিল্লায় ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়ার বিস্তারও কিশোরদের অপরাধের পথে ধাবিত করছে। ফুটপাত, দোকান, গ্যারেজ বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদাবাজি এবং নারী ও কিশোরীদের উত্ত্যক্ত বা যৌন হয়রানির অভিযোগও রয়েছে এসব গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে কেবল পুলিশি ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। অপরাধের সঠিক ধারায় মামলা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কিশোরদের পেছনে থাকা ‘বড় ভাই’, পৃষ্ঠপোষক, অর্থদাতা এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। এছাড়া প্রান্তিক পরিবারের কর্মহীন ও স্কুলছুট কিশোরদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিকভাবেও এ বিষয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
পুলিশ কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, দেশের অধিকাংশ জেলা ও মহানগর পুলিশের কাছে কিশোর গ্যাংয়ের হালনাগাদ তালিকা নেই, যার ফলে অপরাধীদের শনাক্তকরণে তথ্যের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি উত্তরণে গত রবিবার পুলিশ সদর দপ্তরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ক্রাইম জোন ও ডিবি কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ডিএমপির কর্মকর্তাদের পৃথক প্রস্তাবনা জমা দিতে বলা হয়েছে, যা নিয়ে আগামী বুধবার পরবর্তী সভায় আলোচনা হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান আইনের সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা চলছে। বর্তমানে ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের ১৫৮টি গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের মোট সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ২১৯ জন।
ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন জানান, ঢাকা মহানগর পুলিশ কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্তরে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে। যাদের অপরাধের পূর্ব রেকর্ড নেই, তাদের সতর্ক করে ও মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, আর পেশাদার অপরাধীদের নিয়মিত মামলায় গ্রেপ্তার করে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সামারি ট্রায়ালে সাজা দেওয়া হচ্ছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের পেছনে অনেক সময় প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী, মাদক ব্যবসায়ী বা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের মদদ থাকে। তাই কিশোরদের পাশাপাশি তাদের নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের চিহ্নিত করে আইনের মুখোমুখি করা জরুরি।
বর্তমানে ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের ১৫৮টি গ্রুপ রয়েছে, যার মোট সদস্য সংখ্যা ১২১৯।





