বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পের কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ

Published: September 27, 2026, 5:51 am

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়া থেকে শুরু করে হোয়াইট হাউসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক—এসবের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান আবারও জানান দিতে চেয়েছিলেন। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এক সপ্তাহের এই কূটনৈতিক তৎপরতা দেশ ও বিদেশে তাঁর সামনে থাকা সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে খুব একটা কাজে আসেনি। ট্রাম্প বর্তমানে যে সংকটগুলোর মধ্যে আছেন, তার মধ্যে ইরান যুদ্ধ অন্যতম। এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমেছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে চীনের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতাও তাঁর পররাষ্ট্রনীতিকে থমকে দিয়েছে।

নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য সংকট থেকে শুরু করে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ পর্যন্ত নানা বিষয়ে ট্রাম্প বিশ্বনেতাদের বাধার মুখে পড়েছেন। এর মধ্যে আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ট্রাম্পের নীতির কারণে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা তাঁর রাজনৈতিক পরিসর আরও সংকুচিত করতে পারে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল সিচুয়েশন রুমের প্রধান ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ট্রাম্প এমন এক বিশ্বে আমাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন যেখানে শক্তিই ন্যায়ের ভিত্তি, কিন্তু সি চিন পিং ও ক্রমবর্ধমান চীনা শক্তির প্রসঙ্গ এলেই তিনি বেশ নরম হয়ে যান।

গত মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ট্রাম্পের ভাষণ ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গড়ে তোলা নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে যেভাবে নাড়িয়ে দিয়েছেন, তাঁর ভাষণে সেই চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি ইরানকে নতুন করে হুমকি দিয়ে বলেন, ইরান হয় চুক্তিতে রাজি হবে, না হয় দেশটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে। এছাড়া ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে তিনি বলেন, ‘বিজয়ীরাই লুটের মালের অধিকার পায়।’ আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের পথ থেকেও তিনি সরে আসেননি।

পরদিন বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মুখোমুখি হন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন থাকলেও বাস্তব ফলাফল ছিল সীমিত। দুই নেতা এআই, বাণিজ্য, তাইওয়ান ও ইরানের মতো জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা করলেও তেমন অগ্রগতি হয়নি। তবে দুই দেশের বাণিজ্য সমঝোতার মেয়াদ দুই মাস বাড়ানো হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সি তাঁকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পের এই আপাত সংঘাত এড়িয়ে চলার অবস্থান তাঁর আগের কঠোর শুল্কনীতির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। বিরল খনিজের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ থাকায় ট্রাম্পের আগের হাতিয়ার বুমেরাং হয়েছে, কারণ প্রতিশোধ হিসেবে চীন এগুলোর সরবরাহ বন্ধ রাখার সক্ষমতা দেখিয়েছে।

ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ইয়ান ব্রেমার এক্সে লিখেছেন, এক বছর আগে খুব কম দেশই ট্রাম্পের বিরোধিতা করার সাহস পেত, কিন্তু এখন কানাডা, চীন, ইরান ও রাশিয়াসহ অন্যরা আরও বেশি করে ‘না’ বলতে প্রস্তুত। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁও বিশ্বে ‘জঙ্গলের আইন’ ফিরে আসার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তবে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি বাধার মুখে পড়ার ধারণা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, জাতিসংঘে ট্রাম্পের বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে মার্কিন স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার সাফল্য তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার বিষয়টিও রয়েছে। যদিও ইরান বরাবরই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে আসছে।

ট্রাম্পের এই ব্যস্ত কূটনৈতিক সপ্তাহজুড়ে ছায়ার মতো ছিল ইরান যুদ্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। প্রায় সাত মাস ধরে চলমান এই যুদ্ধ বন্ধের কোনো লক্ষণ নেই এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ইরান অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লেও পিছু হটেনি, যা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ইউক্রেন ও রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা এবং গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর দাবিও তাঁর প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোয়নি। জাতিসংঘে ভাষণের সময় ট্রাম্প নিজেই নিজের প্রভাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ‘দেখা যাক আমার আদৌ কোনো ক্ষমতা আছে কি না। হয়তো আছে, আবার হয়তো নেই।’

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo