সার ব্যবস্থাপনার ভুল নীতি, ডিলার নিয়োগের শর্তে বারবার পরিবর্তন এবং দলীয়করণের কারণে দেশের কৃষি খাতে গভীর অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সার মজুতের দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ে সার নিয়ে নৈরাজ্য থামছে না। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় সার সংকট চরমে পৌঁছেছে, যার ফলে গুদাম ভাঙচুর, লুটপাট ও অপ্রীতিকর ঘটনার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অপচেষ্টাই এই কৃত্রিম সংকটের মূল কারণ।
২০০৯ সালের নীতিমালা অনুযায়ী, একটি ইউনিয়নে একজন মূল ডিলার এবং তার অধীনে ৯ জন খুচরা বিক্রেতা থাকার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে নীতিমালায় পরিবর্তন এনে প্রতি ইউনিয়নে তিনজন ডিলারের অধীনে দুজন করে খুচরা বিক্রেতা নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কৃষিবিদ ড. মনিরুজ্জামানের মতে, এই নীতি ভুল এবং এটি বাজারে মনোপলি বা একচেটিয়া ব্যবসা তৈরি করবে। তিনি মনে করেন, ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে একজন করে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হলে তারা ব্যবসায়িক সুনাম রক্ষার্থে সংকটের সুযোগ নিত না। প্রতিষ্ঠিত ডিলারদের বাদ দিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক মদদপুষ্ট নতুন মুখদের ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় বিশৃঙ্খলা আরও বেড়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় ও সরকারের দাবি, আগামী বোরো মৌসুমের শুরু অর্থাৎ ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে পর্যাপ্ত সার রয়েছে এবং বিদেশ থেকে সাতটি লটে সার আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ১৬ আগস্ট কৃষি সচিব মো. সেলিম খানও মজুত পর্যাপ্ত বলে জানিয়েছিলেন। তবে মাঠের চিত্র ভিন্ন। ১৬ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের রাজীবপুরে কৃষকরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাননি এবং ২০ সেপ্টেম্বর সার না পাওয়ার অভিযোগে কৃষকরা মহাসড়ক অবরোধ করেন। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) বলছে, পুরোনো নীতি মেনে সার বণ্টনের ফলেই সংকট হচ্ছে। এছাড়া ২১ সেপ্টেম্বর বিএফএ নীতিমালা-২০২৬-এর অস্পষ্টতা দূর না হওয়া পর্যন্ত নতুন নিয়োগ স্থগিতের দাবি জানিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় গত পাঁচ বছরের তুলনায় অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি এই পরিস্থিতির পেছনে গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। অন্যদিকে, অনিয়ম দমনে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। আগস্ট মাসে ২০৯টি মোবাইল কোর্টে ৩৪ লাখ ৬৯ হাজার টাকা জরিমানা এবং ১৩টি মামলা করা হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ১৩৮টি অভিযানে ২২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা জরিমানা ও পাঁচটি মামলা হয়েছে। মাগুরা ও ঝিনাইদহের দুটিসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ডিলারশিপ বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। কুড়িগ্রামের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে।
ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক চাপের অভিযোগও রয়েছে। চুয়াডাঙ্গায় ৪৫টি ডিলারশিপের বিপরীতে ৬৪৩টি আবেদন জমা পড়েছে, যাদের বড় অংশ রাজনৈতিক নেতাকর্মী। ডিপ্লোমা কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের সভাপতি মো. জিয়াউল হায়দার পলাশ নতুন ডিলার নিয়োগে দলীয়করণের কুফল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং জোনভিত্তিক অন্তত দুই থেকে তিন মাসের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘বাফার স্টক’ স্থাপনের সুপারিশ করেছেন। কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, অনিয়ম বন্ধ করাই নীতিমালা পরিবর্তনের উদ্দেশ্য এবং নীতিমালা লঙ্ঘন করলে ডিলারশিপ বাতিলের বিধান রাখা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে জবাবদিহি ও স্বচ্ছ বিতরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে মাঠের চিত্র ভিন্ন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ভোরে কুড়িগ্রামের রাজীবপুরে হাজার হাজার কৃষক লাইনে দাঁড়ান। কিন্তু তারা চাহিদা অনুযায়ী সার পাননি। একজন ডিলার ৫৬০ বস্তা সার বিতরণ করলেও চাহিদা প্রায় ৫,০০০ বস্তা বলে স্থানীয় কৃষকদের বক্তব্যে উঠে আসে। কুড়িগ্রামে সার না পাওয়ার অভিযোগে ২০ সেপ্টেম্বর কৃষকদের মহাসড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটে।
নতুন ডিলার নিয়োগের মধ্যেই ২১ সেপ্টেম্বর বিএফএ নীতিমালা-২০২৬-এর কয়েকটি ধারা নিয়ে অস্পষ্টতা দূর না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগ স্থগিতের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি ডিলারদের বস্তাপ্রতি বিক্রয় কমিশন ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০০ টাকা করার দাবিও জানিয়েছে। তাদের দাবি, নতুন কাঠামোতে বিদ্যমান ডিলারদের মর্যাদা, ডিলার ইউনিট, সংখ্যা ও দায়িত্ব নিয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন।





