কুমিল্লায় টিকটকের আড়ালে বাড়ছে কিশোর গ্যাং, অস্ত্রের মহড়ায় ছড়াচ্ছে আতঙ্ক

Published: September 23, 2026, 6:38 am

কুমিল্লায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টিকটক ভিডিও তৈরির আড়ালে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। সম্প্রতি ১৩ বছর বয়সী কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি জঙ্গলে নিয়ে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়া ও হত্যার ঘটনায় দুই কিশোর গ্রেপ্তার হওয়ার পর এই সামাজিক ব্যাধিটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কুমিল্লা শহরে বর্তমানে অন্তত ২০টি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। বিগত সাড়ে আট মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম জড়িয়েছে।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিন মূলত একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন এবং অপ্রতিমকেও সেই দলে ভেড়ানোর চেষ্টা ছিল তাঁর। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তুহিন গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি গ্যাং পার্টির আয়োজন করেন এবং নিজের শক্তি প্রদর্শন করতে কিশোরদের নিয়ে ফেসবুকে ছবিও পোস্ট করেন। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া অন্য দুই কিশোরের একজন তার সৌদিপ্রবাসী বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আইফোন কিনে নিয়মিত টিকটকে ভিডিও পোস্ট করত। অন্যজন কিনেছিল একটি মোটরসাইকেল, যা দিয়ে সে তুহিনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। এদিকে, অপ্রতিমের মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর নাহিদা বেগম সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশে সোপর্দ করেছিলেন। সেই ক্ষোভ থেকে তাঁর একমাত্র সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌন মিছিল ও বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের এই তৎপরতা হঠাৎ শুরু হয়নি। ২০১৫ সালের দিকে নগরে প্রথম তিন-চারটি দল সক্রিয় হওয়ার মাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় আসে। ২০২২ সালের দিকে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় অন্তত ২০টিতে। সে সময় রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, ইগল, আরজিএস, র‍্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিএমসি, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ ও বস নামের গ্রুপগুলো বেশ সক্রিয় ছিল। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এদের নাম এসেছে। বর্তমানে পুলিশি তালিকায় সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও কিং স্কোয়াড, স্কোয়াড বা রতন গ্রুপ, ইগল, সিবিকে ও ক্রাইম সেটআপ নামের পাঁচটি গ্রুপ সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এছাড়া অপু ও সাব্বিরের নামে দুটি উপ-গ্রুপও রয়েছে।

কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া দিয়ে জনমনে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করছে। গত মে মাসের এক বিকেলে গোমতী নদীর তীরের ভাটারপুকুর থেকে কাপ্তানবাজার, বৌবাজার, চানপুর ও সংরাইশ এলাকায় ১০০ থেকে ১৫০ জন কিশোর ও তরুণ রামদা, চাপাতি ও লাঠি নিয়ে মহড়া দেয়। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, ওই দিনই ‘ক্রাইম সেটআপ’ নামের নতুন এই দলটির আত্মপ্রকাশের তথ্য পুলিশের নজরে আসে। এছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রানীর দিঘির পাড়ে এবং ২৫ এপ্রিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার দিন তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া ও বাজি ফুটিয়ে আতঙ্ক ছড়ায় কিশোর অপরাধীরা।

নগরের বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও মাদক কারবার নিয়ে প্রায়ই এসব গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল রানীর কুঠি এলাকায় নাফিজ অময়কে কুপিয়ে হাত প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দেয় রতন গ্রুপের সদস্যরা। এর জেরে দুর্গাপুর ও রেসকোর্স এলাকায় সেনাবাহিনী, র‍্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে পিস্তল, রিভলভার, গুলি ও মাদকসহ ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর রাতে অশোকতলায় সজীব হোসেন ওরফে বাবু নামের এক সুপারশপ কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, যার নেপথ্যে ছিল কিশোর গ্যাংয়ের মাদক কারবার। একই বছরের জুনে কাঁটাবিল এলাকায় অপু ও সাব্বির গ্রুপের সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয় ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইথান আহমেদ। গত ২ এপ্রিল ধর্মসাগর পাড়ে নারী কনস্টেবল জাকিয়া সুলতানাকে অশালীন মন্তব্য করার প্রতিবাদ করায় তাঁর স্বামী পুলিশ কনস্টেবল কাজী আব্দুল্লাহ মো. জোবায়েরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে রিফাত ও সিয়াম নামের দুই তরুণ।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, গত বছরের ৩০ নভেম্বর তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ২৫০ জনেরও বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে বয়স কম হওয়ায় অনেকেই দ্রুত জামিন পেয়ে আবারও একই অপরাধে জড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবার কাছ থেকে মুচলেকাও নেওয়া হচ্ছে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা (টিপু) বলেন, বর্তমানে কুমিল্লার এমন কোনো পাড়া-মহল্লা নেই যেখানে কিশোর গ্যাং নেই। অতীতে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতারা এদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় জানান, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা এই কিশোরেরা ভবিষ্যতে আরও বড় সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর তৎপরতার পাশাপাশি পরিবারের পক্ষ থেকেও সন্তানদের গতিবিধির ওপর কড়া নজরদারি রাখা জরুরি।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo