অভাব আর প্রতিকূলতা জয় করে জিপিএ-৫ পেল চার অদম্য শিক্ষার্থী

Published: September 23, 2026, 3:51 am

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া এমন কিছু শিক্ষার্থী আছে, যাদের জীবনের গল্প অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার। অদম্য মেধাবীদের নিয়ে প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনে আজ থাকছে চার শিক্ষার্থীর কথা। মায়ের মৃত্যুর পর পড়ার টেবিলে বসার আগে তাদের কাউকে রান্না শেষ করতে হয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর পড়ার খরচ জোগাতে কাউকে টিউশনি করতে হয়েছে। কেউ ছুটির দিনে অন্যের জমিতে কাজ করেছে, আবার কারও বাবার সামর্থ্য না থাকায় এসএসসি পরীক্ষায় বসাটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। তবে থেমে যায়নি পড়াশোনা। অভাব আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও চার শিক্ষার্থী এবার এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ভালো ফলের পর তাদের চোখে এখন বড় হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে সামনে আবারও বাধা—উচ্চশিক্ষার খরচ।

‘মেয়েমানুষ, মন দিয়ে শুধু পড়ালেখাটা করো।’ মেয়েকে প্রায়ই এ কথা বলতেন তাপসী রানী দে। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ছিল অনেক স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই ২০২৩ সালে হঠাৎ স্ট্রোক করে মারা যান তিনি। তখন মেয়ে অনুশ্রী দে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মায়ের মৃত্যুর পর ছোট বোন ও বাবাকে নিয়ে সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই এসে পড়ে অনুশ্রীর কাঁধে। সকালে ঘুম থেকে উঠে হাঁড়িপাতিল মাজা, রান্না করা, পরিবারের সবাইকে খাওয়ানোর পর স্কুলে যেত সে। স্কুল থেকে ফিরে সন্ধ্যা নামার আগেই আবার রান্নার কাজ শেষ করত। এরপর মায়ের কথা মনে করে বই-খাতা নিয়ে বসত পড়তে। এভাবেই পাশাপাশি পড়ালেখা চালিয়ে গেছে অনুশ্রী। এবার এসএসসি পরীক্ষায় শেরপুরের আফসার আলী আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। ১ হাজার ৭৫ নম্বর পেয়ে শেরপুর জেলায় মানবিক বিভাগে প্রথম হয়েছে অনুশ্রী। এ সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন তাকে ক্রেস্ট উপহার দিয়েছেন। শেরপুর শহরের সবজারখিলা মহল্লায় দুই শতক জমির ওপর অনুশ্রীদের দুই কক্ষের একটি ছোট ঘর। বাবা অমিত কিশোর দে আসবাবে রঙের কাজ করেন। কাজ থাকলে দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। তবে প্রতিদিন কাজও জোটে না। এই সামান্য আয়েই দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে হয় তাঁকে। অনুশ্রীর ছোট বোন অন্বেষা দে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মেয়ের এমন সাফল্যে বাবা অমিত কিশোর দে আনন্দিত। তবে সেই আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাও। তিনি বলেন, ‘ওর মা মারা যাওয়ার পর থেকেই মেয়েটার ওপর সংসারের চাপ পড়ে। ঠিকমতো কাপড়চোপড় দিতে পারি নাই, খাবারও ঠিকমতো দিতে পারি না। তারপরও ও আমাদের সামলে, ওর মায়ের কথা রেখেছে।’ এখন মেয়েদের পড়ার খরচ কীভাবে চালাবেন, সেই চিন্তায় আছেন। অনুশ্রীর স্বপ্ন অবশ্য অনেক বড়। পড়ালেখার সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে সে বিচারক হতে চায়। তার ভাষায়, ‘অসহায় ও গরিব মানুষ যেন ন্যায়বিচার পান, আমি সে জন্য কাজ করতে চাই।’ আফসার আলী আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাকির হোসেন বলেন, অনুশ্রীর পরিবার সচ্ছল নয়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সে দারুণ মেধাবী। এসএসসিতে সে মানবিক শাখায় জেলায় প্রথম হয়েছে। পড়ালেখার সুযোগ পেলে সে আরও ভালো করবে। অনেক বড় হবে।

তাসমিয়া তাবাসসুমের বয়স যখন দেড় বছর, তখন মা নুর শাহানা বেগম (৩০) মারা যান। এরপর বেসরকারি স্কুলশিক্ষক বাবা মেছবাহুল আলম দ্বিতীয় বিয়ে করেন। বাবা, বড় ভাই, সৎমা ও বোনকে নিয়ে কোনোমতে সংসার চলছিল। ২০২২ সালের শুরুতে ক্যানসারে আক্রান্ত হন মেছবাহুল আলম। তাসমিয়া তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। বাবার চিকিৎসার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয় পরিবারকে। বাড়ে ঋণ। এরই মধ্যে গত বছরের জুলাইয়ে মারা যান মেছবাহুল। এই বাস্তবতার মধ্যেই তাসমিয়া তাবাসসুম নিজের পড়ালেখা করেছে। সকালে টিউশনি করতে হয়েছে। তারপর বিদ্যালয়ে যাওয়া। বেশির ভাগ সময় নাশতা করা হয়নি। বিকেলে বাড়ি ফিরেও টিউশনি করতে হয়েছে। সহায়তা করতে হয়েছে সংসারের কাজে। তাসমিয়া এবার গাইবান্ধার ঢোলভাঙ্গা বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাদের বাড়ি জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার বেতকাপা ইউনিয়নের নান্দিশহর গ্রামে। তাসমিয়াকে মেধাবী ছাত্রী হিসেবেই জানেন ঢোলভাঙ্গা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা রোকসানা বেগম। তিনি বলেন, পড়ালেখায় যথেষ্ট আগ্রহ থাকায় তাসমিয়াকে বিদ্যালয় থেকে নানাভাবে সহায়তা করা হয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া বড় ভাইয়ের টিউশনের টাকায় কোনোমত সংসার চলছে। ফলে বাধ্য হয়ে তাসমিয়া টিউশনির টাকায় নিজের লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছে। পাশাপাশি সংসারেরও জোগান দিতে হয়েছে। সৎমা জিন্নাতুন নাহার বলেন, মেয়েটা যখন ছোট ক্লাসে ছিল, তখন চিন্তা ছিল না। এখন বড় ক্লাসে উঠবে, পড়াশোনার খরচ বাড়বে। এ ছাড়া যে হারে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, এখন কীভাবে লেখাপড়ার খরচ চালাবেন চিন্তায় আছেন। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নের কথা জানিয়ে তাসমিয়া তাবাসসুম বলে, ‘আমি লেখাপড়া করে চিকিৎসক হতে চাই। সংসারের হাল ধরতে চাই। সংসারের অভাব ঘোচাতে চাই। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব হবে জানি না।’

পরিবারের অভাব ঘোচাতে পড়াশোনার পাশাপাশি মো. কবির হোসেন স্কুল বন্ধের দিনে কখনো অন্যের জমির ধান কেটেছে। কখনো জমিতে চারা রোপণ করার কাজ করেছে। এবার এসএসসি পরীক্ষার সপ্তাহখানেক পরই গ্রাম ছেড়ে গাজীপুরে গিয়ে একটি দোকানে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা বেতনে কাজ শুরু করে। এমন অবস্থার মধ্যেই সে এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক শাখায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। কবির হোসেনের বাড়ি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের বৌলাম গ্রামে। বাবা রেজাউল করিম পেশায় দিনমজুর। পাশাপাশি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। মা মোছা. চন্দনা গৃহিণী। নিজেদের সম্পদ বলতে বাড়ির ৪ শতাংশ ভিটেটুকুই। সরেজমিনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই বোন, এক ভাই ও মা-বাবাসহ তাঁদের পাঁচ সদস্যদের সংসার। তিন ভাইবোনের মধ্যে কবির হোসেন দ্বিতীয়। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট বোন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। বাড়িতে জরাজীর্ণ একটি টিনের দোচালা ঘর। কবির হোসেনের মা মোছা. চন্দনা বলেন, ‘হে (কবির) পরীক্ষায় এ প্লাস পাইছে তো কী অইছে? আমরা হেরে লেহাপড়া করাইবার কুনু সামর্থ্য নাইগা। কুনুরহমে দুই বেলা খাইয়া না খাইয়া আমরার দিন যায়। হেরে ভালা কলেজও ভর্তি কইরা পড়াইবাম কিবায়?’ কবির হোসেন বলে, ‘যেদিন এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল সেদিন দোকানে কাজ করছিলাম। পরে অন্য একজনের সহায়তায় আমার জিপিএ-৫ পাওয়ার খবরটা পাই। আমি লেখাপড়া করে এসপি (পুলিশ সুপার) হতে চাই। কিন্তু আমাদের সংসারের যা অবস্থা তাতে আমার স্বপ্নটা কি স্বপ্নই থেকে যাবে কি না, তা বুঝে উঠতে পারছি না।’ কবির ধর্মপাশা উপজেলার বাদশাগঞ্জ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। স্কুলটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ খলিলুর রহমান বলেন, ‘কবির হোসেন দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিলেও সে অত্যন্ত মেধাবী। সুষ্ঠু পরিবেশে লেখাপড়া করার সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে সে অনেক ভালো করবে বলে আমার বিশ্বাস।’

দিনমজুরির আয়ে মমেদুল ইসলামের পাঁচ সদস্যের সংসার চলে না। মেয়ের লেখাপড়া খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। এসএসসি ফরম পূরণের সময় মমেদুল তাই মেয়ে ময়না খাতুনকে জানিয়ে দেন তাকে আর পড়াতে পারবেন না। তখন প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেমের সহযোগিতায় ফরম পূরণ করে পরীক্ষায় অংশ নেয় ময়না। সেই ময়না এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। ময়নাদের বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের বৈদ্যনাথপুর গ্রামে। সে বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে অংশ নিয়েছিল। ময়নার স্বপ্ন, লেখাপড়া শেষ করে চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করার। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কলেজে পড়ার খরচ। ময়না খাতুন বলে, ‘আমি লেখাপড়া শেষ করে চিকিৎসক হতে চাই। এটা আমার মা-বাবার স্বপ্ন। কিন্তু বাবার আর্থিক সচ্ছলতা নেই। তবু বাবা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়ানোর চেষ্টা করেছে। জানি না আমার লেখাপড়া কত দূর পর্যন্ত যাবে।’ ছয় শতক জমির ওপর দুটি টিনের ঘর রয়েছে মমেদুল ইসলামের। তিনি বলেন, ‘সব সময় গ্রামে দিনমজুরির কাজ থাকে না। যখন কাজ পাই তখন ৫০০ টাকা দিন কামাই হয়। এই টাকা চিকিৎসা, সংসারের খরচ চালাতেই আটে না। বেটির পড়ার খরচ কেমন করি দেইম। এ্যালা কয়ছে ওয় ভালো রেজাল্ট করছে। ভালো কলেজোত ভর্তি করা নাগবে। কিন্তু মোর তো চাল আনতে তরকারি জোটেনা। ওক কেমন করি পড়াইম।’ বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম বলেন, ময়না দরিদ্র পরিবারের হলেও অদম্য মেধাবী। সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে সে আরও ভালো কিছু করবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo