বোর্হেসকে লেখা সুসান সন্টাগের সেই চিঠি: বইয়ের ভবিষ্যৎ ও অন্তর্জগত

Published: September 21, 2026, 9:35 am

সুসান সন্টাগ বেঁচে থাকলে আজ তার বয়স হতো ৯৫ বছর। তার প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা এবং অসাধারণ রুচিবোধ তাকে সাহিত্যের জগতে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কোনো কিছুর প্রচলিত মানদণ্ড ছাপিয়ে তার অতিরঞ্জন বা অদ্ভুত সৌন্দর্যের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল তার রুচির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি জানতেন কোনটি ভালো এবং সেই ভালো নিয়ে কীভাবে কথা বলতে হয়। এমনকি যখন অন্যরা তার সঙ্গে একমত নাও হতে পারতেন, তখনও তিনি নিজের অবস্থানে অটল ছিলেন। ‘ক্যাম্প’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, এটি হলো ‘খারাপ রুচির ভালো রুচি’। অর্থাৎ প্রচলিত মানদণ্ডে মূল্যহীন কোনো কিছুর অতিরঞ্জন বা কৃত্রিমতার মধ্যেও যে বিশেষ আনন্দ আছে, তা চিনে নেওয়ার চোখ ছিল তার। এ কারণেই হোর্সে লুইস বোর্হেসের সাহিত্যের অনুরাগী ও বন্ধু ছিলেন তিনি।

বোর্হেসের মৃত্যুর দশ বছর পর সন্টাগ তাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যা ২০০১ সালে তার ‘হোয়্যার দ্য স্ট্রেস ফল্‌স: এসেইজ’ সংকলনে প্রকাশিত হয়। চিঠিতে তিনি বোর্হেসকে হারানোর বেদনা, সাহিত্যের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবী নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, ডিজিটাল যুগে বই যখন হাতের নাগালে এবং সম্পাদনাযোগ্য হয়ে উঠবে, তখন মানুষের ভেতরের সেই নীরব জগৎ বা ‘ইনওয়ার্ডনেস’ হারিয়ে যেতে পারে। তার মতে, বইয়ের জায়গা নিতে পারে বিজ্ঞাপননির্ভর ও পর্দা-চালিত এক ‘টেক্সট’, যার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হবে কেবল ব্যবহারের।

বোর্হেসকে উদ্দেশ্য করে তিনি লিখেছিলেন, সময়ের কাছে দশ বছর হয়তো সামান্য, কিন্তু একজন মানুষের অনুপস্থিতি মাপতে গেলে এটি এক দীর্ঘ শূন্যতা। সন্টাগের মতে, বোর্হেস ছিলেন এমন এক লেখক যিনি তার সময় ও সংস্কৃতিকে অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। তিনি বোর্হেসের বিনয়, আত্মিক নির্মলতা এবং অন্ধত্বকে সম্পদে পরিণত করার ক্ষমতার প্রশংসা করেন। ১৯৮২ সালের এক সাক্ষাৎকারে সন্টাগ বলেছিলেন, জীবিত লেখকদের মধ্যে অন্য লেখকদের কাছে বোর্হেসের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কেউ নেই। তিনি আরও বলেছিলেন, খুব কম লেখকই আছেন যারা বোর্হেসের কাছ থেকে কিছু শেখেনি বা তাকে অনুকরণ করেনি।

চিঠিতে সন্টাগ উল্লেখ করেন, বোর্হেস মানুষকে কল্পনার নতুন পথ দেখিয়েছিলেন, অথচ বারবার মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে আমরা অতীতের কাছে ঋণী। বই যদি হারিয়ে যায়, তবে ইতিহাসও হারাবে, আর ইতিহাস হারালে মানুষ তার নিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারাবে। সন্টাগ মনে করতেন, বই কেবল স্বপ্ন ও স্মৃতির সংগ্রহ নয়, এটি মানুষকে সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার পদ্ধতি শেখায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, বই আজ এক বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বইয়ের সঙ্গে মানুষের একাকী সম্পর্ক এবং পড়ার নীরবতা বিলীন হওয়ার পথে। বাঘটি ইতিমধ্যেই গ্রন্থাগারে ঢুকে পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, কিছু পাঠক এখনও সেই মহান গ্রন্থাগার ছেড়ে যাবে না এবং নীরব পাঠের কাছে ফিরে আসবে। সেখানে বোর্হেস তাদের পৃষ্ঠপোষক ও নায়ক হয়ে থাকবেন। সন্টাগের মতে, কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের লেখা সময়ের ভেতর দিয়ে এমনভাবে হাঁটে যে তাদের অনুপস্থিতিও এক ধরনের উপস্থিতি হয়ে থাকে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin