যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েন: ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে কানাডা

Published: September 21, 2026, 6:26 am

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ৫৪

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে ফ্রান্সের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা, মহাকাশ গবেষণা, প্রতিরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়াতে একমত হয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।

রোববার কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের কাছে আটলান্টিক উপকূলে অবস্থিত ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রিত দ্বীপপুঞ্জ সাঁ-পিয়ের ও মিকেলনে দুই নেতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কানাডার কোনো প্রধানমন্ত্রী এবং ফ্রান্সের কোনো প্রেসিডেন্টের জন্য এটিই ছিল প্রথম যৌথ সফর। এছাড়া ২০১৪ সালের পর ওই অঞ্চলে এটিই কোনো ফরাসি প্রেসিডেন্টের প্রথম সফর। কৌশলগতভাবে আর্কটিক অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত এই ফরাসি ভূখণ্ডটি কানাডার সঙ্গে জ্বালানি ও অন্যান্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বৈঠক শেষে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সার্বভৌমত্বের ওপর নতুন হুমকির মুখে বিশ্ব এখন নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই পরিস্থিতিতে কানাডা ও ফ্রান্সের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার উপযুক্ত সময় এসেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানান, মহাকাশ, জলবায়ু ও জ্বালানি খাতে দুই দেশ সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, আন্তর্জাতিক আইন, অবাধ ও ন্যায্য বাণিজ্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিজ্ঞানের ভূমিকার বিষয়ে দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ অভিন্ন।

কানাডা ও ফ্রান্সের এই ঘনিষ্ঠতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়েন বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত শুল্কনীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিষয়ে তাঁর নানা মন্তব্যের পর ওটাওয়া এখন ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি ট্রাম্পের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে কানাডা, গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ডসহ উত্তর আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা মার্কিন পতাকায় ঢাকা দেখানো হয়, যার মধ্যে ফরাসি ভূখণ্ড সাঁ-পিয়ের ও মিকেলন এবং ফ্রান্সের ক্যারিবীয় ভূখণ্ডও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ প্রসঙ্গে ম্যাক্রোঁ কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, এই ভূখণ্ডগুলো যে ফ্রান্সের অংশ, তা বারবার নতুন করে বলার কোনো প্রয়োজন নেই।

কানাডার ইউরোপমুখী এই কূটনৈতিক তৎপরতা কেবল ফ্রান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া এক বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী কার্নি বলেছিলেন, কানাডা ও ইউরোপ নিজেদের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াতে গভীর সহযোগিতা করতে পারে। সেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ ও ডিজিটাল বাণিজ্যকে সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন।

ইউরোপীয় Unions (ইইউ) সঙ্গেও সম্পর্ক আরও নিবিড় করার উদ্যোগ নিয়েছে কানাডা। গত সপ্তাহে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন কানাডাকে ইইউর প্রথম ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ হওয়ার প্রস্তাব দেন, যাকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী কার্নি। যদিও ইইউর আইনে এখনও ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ পদের সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই। বর্তমানে কানাডা ও ইইউর মধ্যে জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, সাইবার নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং আর্কটিক অঞ্চলে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে।

বৈঠকে ফ্রান্সের সঙ্গে আলোচনায় জ্বালানি নিরাপত্তাও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ইউরোপে কানাডার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন দুই নেতা। ম্যাক্রোঁর মতে, কানাডার এলএনজি প্রকল্পগুলো ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কানাডা-ইইউ সম্পর্ক আরও গভীর করার পথে কিছু জটিলতাও রয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি ‘কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক অ্যান্ড ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ (সিইটিএ) এখনও ইইউর সব সদস্যরাষ্ট্রের অনুমোদন পায়নি। ফলে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবুও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের এই সময়ে কানাডা ইউরোপের সঙ্গে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করার পথেই এগোচ্ছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh