আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, সমান অধিকার ও মর্যাদা সুনিশ্চিত করতে সহিংসতা, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি রোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথ থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন, অনলাইন মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মসহ সর্বত্র কন্যাশিশুর সুরক্ষায় দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার ও আইনের কঠোর প্রয়োগের বিকল্প নেই।
সোমবার বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল গার্ল চাইল্ড অ্যাডভোকেসি ফোরামের (এনজিসিএএফ) যৌথ উদ্যোগে এক আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান।
অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, কন্যাশিশুর কল্যাণে সমাজের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন সবচেয়ে জরুরি। ছেলেদের মতো মেয়েদেরও সমান গুরুত্ব দিয়ে তাদের স্বপ্নপূরণের পথ তৈরি করে দেওয়াকে গুরু দায়িত্ব অভিহিত করে তিনি বলেন, শিক্ষা, চিকিৎসা, খেলাধুলা, প্রযুক্তি, গণমাধ্যম, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনসহ নানা ক্ষেত্রে মেয়েরা নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের আন্তর্জাতিক সাফল্য এবং নিশাত মজুমদারের এভারেস্ট জয়ের উদাহরণ টেনে বলেন, এসব অর্জন গোটা দেশের জন্য গর্বের বিষয়।
অভিভাবকদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি আহ্বান জানান, কন্যাসন্তানকে বোঝা না ভেবে সম্ভাবনার দুয়ার হিসেবে দেখতে হবে। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের সমান মর্যাদা দেওয়ার এবং ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের শিক্ষা দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে মেয়েদের বিয়ের জন্য সঞ্চয় করার আগে তাদের শিক্ষা ও সার্বিক কল্যাণে অর্থ বিনিয়োগের পরামর্শ দেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, কন্যাশিশুর জন্ম কোনো বোঝা নয়, বরং এটি অফুরন্ত সম্ভাবনার সূচনা। শিক্ষা পাওয়া তাদের মৌলিক অধিকার এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব।
দুই কন্যার পিতা হিসেবে আবেগপ্রবণ হয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, দেশের প্রতিটি কন্যাশিশুর মধ্যে তিনি নিজের সন্তানদের মুখ দেখতে পান। তাই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা কেবল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নয়, বরং গভীর মমতারও প্রকাশ। ধর্মে কন্যাসন্তানকে স্রষ্টার নেয়ামত হিসেবে বর্ণনা করে সব ধর্মের নৈতিক শিক্ষায় নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষার নির্দেশ রয়েছে বলেও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
এ বছরের কন্যাশিশু দিবসের প্রতিপাদ্য ‘শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়’ তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি মন্তব্য করেন, বাল্যবিয়ে শিশুদের শৈশব কেড়ে নেয়, শিক্ষাজীবন ব্যাহত করে এবং অকাল মাতৃত্ব, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সহিংসতার শঙ্কা তৈরি করে। নির্যাতন প্রতিহত করতে উপজেলার পর্যায় পর্যন্ত কিশোরীবান্ধব ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা এবং সরকারি হেল্পলাইন নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে কন্যাশিশুদের নিজেদের অধিকার সচেতন হওয়ার, আত্মরক্ষার জন্য মার্শাল আর্ট শেখার এবং বিশ্বস্ত অভিভাবক, শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবগত করার পরামর্শ দেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, তিনি নারী শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে উপবৃত্তি চালু ও বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ সৃষ্টি করে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছিলেন। নারীদের উন্নয়ন ও নিরাপত্তায় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি জানান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। রাজনীতি, প্রশাসন, সামাজিক অংশগ্রহণ ও মনোভাবের ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমেই কন্যাশিশুদের বিশ্বজয়ের পথ সুগম হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এই অনুষ্ঠানে অন্য অতিথিদের মধ্যে দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর প্রশান্ত ত্রিপুরা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব রওশন আরা বেগম এবং এনজিসিএএফের সহসভাপতি শাহীন আক্তার বক্তব্য দেন। এর আগে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শায়লা শারমিন জামান স্বাগত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয় এবং দুজন কন্যাশিশু তাদের নিজ নিজ মতামত তুলে ধরে।





