দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে বর্তমানে বহুমুখী চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের একদিকে যেমন সাধারণ অপরাধ দমন, মাদক নিয়ন্ত্রণ, খুন, ছিনতাই ও ডাকাতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই রাজনৈতিক পরিস্থিতির জটিল সমীকরণ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি বাহিনীর ওপর বাড়তি দায়বদ্ধতা তৈরি করেছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, কোনো এলাকায় এমন মিছিল হলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এবং তদারকি কর্মকর্তাদের দায় নিতে হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ সেপ্টেম্বর গুলশানের একটি ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় ব্যর্থতার দায়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান জোনের ডিসি ও ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা ঢাকার ৫০ থানার ওসি ও জোনাল কর্মকর্তাদের মধ্যে চাপের সৃষ্টি করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সারাদেশের রেঞ্জ ডিআইজি, জেলা পুলিশ সুপার এবং মহানগর পুলিশ কমিশনারদের এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা মনে করেন, পুলিশ যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভ্যস্ত হলেও বর্তমান সময়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিবিড় তদারকি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। তার মতে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশের অভ্যন্তরে দীর্ঘ ১৭ বছরের জঞ্জাল পরিষ্কারের প্রক্রিয়া চলছে, তবে এতে যেন কোনো নিরীহ কর্মকর্তা ক্ষতিগ্রস্ত না হন বা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে হতাশা তৈরি না হয়, সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকও একই মত প্রকাশ করে বলেন, অপরাধের সঙ্গে রাজনীতির সংযোগ নিরসনে পুলিশকে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে, যা বাহিনীর মনোবলকে দুর্বল করতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল, যার মধ্যে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৫৭টি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখনো ১ হাজার ৩০৬টি বা প্রায় ২৩ শতাংশ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। এর পাশাপাশি বিএনপি সরকারের ছয় মাসে ৩১৭টি পুলিশ আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, যা এর আগের ছয় মাসে ২৭৫টি ছিল।
বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও পুলিশ বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। গত দুই বছরে ১৯৭ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং আরও অনেকের বিষয়ে একই শঙ্কা কাজ করছে, যা বাহিনীর বড় একটি অংশের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করা এবং পলাতক আসামি গ্রেপ্তার করার তাগিদ রয়েছে। পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, অনলাইন জুয়া ও প্রতারণার মতো নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলা করতে গিয়ে মাঠ পুলিশকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।





