ঋণ নিয়ে গড়া ফুটবল একাডেমিতে স্বপ্ন বুনছেন পাহাড়ি কিশোরীরা

Published: November 7, 2026, 3:43 am

রাঙামাটির কাউখালী উপজেলা পরিষদ মাঠে প্রতিদিন ভোরে ও বিকেলে একদল কিশোরীকে কঠোর অনুশীলনে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে কেউ বল নিয়ে দৌড়াচ্ছে, কেউ সতীর্থকে পাস দিচ্ছে, আর মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে বাঁশি হাতে নির্দেশনা দিচ্ছেন কোচ সুইহলামং মারমা। এই দৃশ্যটি একটি ফুটবল একাডেমির, যা পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া কিশোরীদের স্বপ্নপূরণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ফুটবল দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সুইহলামং মারমা পার্বত্য অঞ্চলের কিশোরীদের ফুটবলে দক্ষ করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৮ সালে এই একাডেমিটি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে মাত্র ১৪ জন খেলোয়াড় নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে এখানে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসা ৪২ জন কিশোরী প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।

একাডেমি গড়ে তোলার পেছনে ছিল এক কঠিন লড়াই। শুরুতে নিজের ও স্ত্রীর বেতনের বড় অংশের পাশাপাশি আনসার ও ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে চার লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন সুইহলামং। বর্তমানে একাডেমি পরিচালনার জন্য একটি ভাড়া বাসায় আবাসন ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার জন্য মাসে ২০ হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হয়। আর্থিক সংকট কাটাতে তাকে এনজিও ও সমবায় সমিতি থেকেও ঋণ নিতে হয়েছে, যে অর্থ দিয়ে খেলোয়াড়দের জুতা, জার্সি ও বল কেনা হয়। তবে বর্তমানে সেনাবাহিনী, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান একাডেমিটিকে এককালীন সহায়তা দিচ্ছে এবং কিছু খেলোয়াড় মাসে এক থেকে দেড় হাজার টাকা দিয়ে একাডেমির খরচ বহনে সহায়তা করছে।

এই একাডেমির সাফল্য ঈর্ষণীয়। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া আটজন নারী ফুটবলার বিভিন্ন বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেয়েছে। এছাড়া আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে ৫০ জন, সেনাবাহিনীতে ছয়জন, পুলিশে একজন এবং বিমানবাহিনীতে একজন খেলোয়াড় কোটায় চাকরি পেয়েছে। পাশাপাশি ছয়জন বিকেএসপিতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে এবং অনেকে ফেন্সিং, জুডো ও সাইক্লিংয়েও নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করছে। জাতীয় দলের খেলোয়াড় ঋতুপর্ণা চাকমা, রূপনা চাকমা, মনিকা চাকমা, আনাই মোগিনী ও আনুচিং মোগিনীকেও আগে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন সুইহলামং মারমা। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তাঁদের ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি।

একাডেমির খেলোয়াড়দের মধ্যে বান্দরবানের আনিষা তঞ্চঙ্গ্যা বাংলাদেশ আনসার একাডেমির ফেন্সিং টিমে জায়গা করে নিয়েছে। খাগড়াছড়ির অর্কি চাকমা ও বাঘাইছড়ির আকর্ষণী চাকমার মতো তরুণীরা এখন জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখছে। স্থানীয় প্রশাসনও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাজিব হোসেন জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রশাসন একাডেমির কিশোরীদের ক্রীড়াসামগ্রী প্রদান ও খাবারের ব্যবস্থা করে সহায়তা করছে।

সুইহলামং মারমা বলেন, পাহাড়ি কিশোরীদের ফুটবলের জন্য সুপ্ত সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই একাডেমি থেকেই আগামী দিনে আরও অনেক ঋতুপর্ণা, মনিকা ও রূপনার মতো খেলোয়াড় উঠে আসবে, যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকা উঁচুতে তুলে ধরবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo