বান্দার সঙ্গে মহান স্রষ্টার গভীর সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো প্রতিনিয়ত আল্লাহ তাআলাকে স্মরণে রাখা। মানুষের অন্তরের বিশ্বাস, মুখের ভাষা ও আচরণের সমন্বয়ে আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করার মধ্য দিয়েই আত্মিক বিকাশ ও প্রকৃত মানসিক প্রশান্তি অর্জিত হয়। বিপরীতে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হলে মানুষের আত্মা নির্জীব হয়ে পড়ে এবং মানবজীবন বিভ্রান্তি ও ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে যাওয়ার বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক ও ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। আলেম ও লেখক মাহমুদ হাসান ফাহিম এ বিষয়ে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতির কথা তুলে ধরেছেন।
আল্লাহর জিকির বা স্মরণ ত্যাগ করার সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে মানুষের মনের ওপর। এতে করে জীবনের সমস্ত শান্তি ও আত্মিক প্রশান্তি বিলীন হয়ে যায়। বাহ্যিক বা বস্তুগত নানা সুবিধাদি থাকলেও মানুষ ভেতরের আত্মিক অশান্তি ও মানসিক সংকীর্ণতা কাটিয়ে উঠতে পারে না। এ প্রসঙ্গে সুরা ত্বহার ১২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে বড় সংকটময়। আর কেয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ করে উঠাব।’
আল্লাহর স্মরণহীন হৃদয় ধীরে ধীরে শয়তানের স্থায়ী আস্তানায় পরিণত হয়। শয়তান তখন মানুষকে পাপের পথকে আকর্ষণীয় করে দেখায় এবং বিভ্রান্তির গহ্বরে ঠেলে দেয়। সুরা জুখরুফের ৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করি, অতঃপর সে হয় তার নিত্যসঙ্গী।’ এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবিত ও মৃতের উপমা দিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে এবং যে ব্যক্তি তার প্রতিপালককে স্মরণ করে না, তাদের দুজনের উপমা হলো জীবিত ও মৃতের ন্যায়’ (সহিহ বুখারি: ৬৪০৭)। এছাড়া মিশকাতুল মাসাবিহের ২২৮১ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, বান্দা যখন আল্লাহর জিকির করে তখন শয়তান পালিয়ে আত্মগোপন করে, কিন্তু জিকির থেকে উদাসীন হলেই সে মনে প্ররোচনা ও কুচিন্তা ঢালতে শুরু করে।
নিয়মিত জিকির ও আল্লাহর স্মরণ না থাকার কারণে মানুষের অন্তর বা কলব দিনে দিনে কাঠিন্য অর্জন করে। একপর্যায়ে অন্তরে সৎ কাজের প্রতি আর কোনো আগ্রহ বা ভালোবাসা থাকে না, এমনকি পাপাচারের জন্য কোনো ভয় কিংবা অনুশোচনাও কাজ করে না। সুরা জুমারের ২২ নম্বর আয়াতে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সুতরাং ধ্বংস সেই কঠোরপ্রাণ মানুষদের জন্য, যারা আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ। তারা সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিপতিত।’
রবের স্মরণ ছেড়ে দেওয়ার ফলে ইবাদতের একাগ্রতা ও আন্তরিকতা ধাপে ধাপে নষ্ট হয়ে যায়। মানুষের মন তখন দুনিয়াবি নানা চিন্তায় বুঁদ হয়ে থাকে এবং তার আচরণে নেফাকের আলামত প্রকাশ পেতে শুরু করে। সুরা নিসার ১৪২ নম্বর আয়াতে মুনাফিকদের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘মুনাফিকরা আল্লাহর সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে, অথচ তিনিই তাদের ধোঁকায় ফেলে রেখেছেন। যখন তারা নামাজে দাঁড়ায়, অলসভাবে দাঁড়ায়। তারা মানুষকে দেখায়। আর তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে।’ আসরের নামাজে অলসতা ও বিলম্বকারীদের সতর্ক করে রাসুলুল্লাহ (সা.) সহিহ মুসলিমের ৬২২ নম্বর হাদিসে বলেন, এটি মুনাফিকের নামাজ; সে বসে সূর্যের অপেক্ষা করতে থাকে, অবশেষে যখন তা শয়তানের দুই শিংয়ের মাঝামাঝি পৌঁছায়, তখন সে উঠে দ্রুত চারটি ঠোকর মারে। আল্লাহকে সে খুব কমই স্মরণ করে।
যাঁরা পৃথিবীতে আল্লাহর দেওয়া হেদায়েত ও স্মরণ থেকে অন্ধ হয়ে থাকে, পরকালে তাঁদের চরম লাঞ্ছনা ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের দৃষ্টিহীন অবস্থায় পুনরুত্থিত করবেন। সুরা ত্বহার ১২৫-১২৬ নম্বর আয়াতে এসেছে, মানুষ তখন প্রশ্ন করবে কেন তাকে অন্ধ করে তোলা হলো, অথচ সে দৃষ্টিমান ছিল। উত্তরে আল্লাহ বলবেন, তাঁর আয়াতসমূহ আসার পরও যেমন সে তা ভুলে গিয়েছিল, তেমনি আজ তাকেও ভুলে যাওয়া হলো। এ ছাড়া সুনানে তিরমিজির ৩৩৮০ নম্বর হাদিসে আল্লাহর নবী (সা.) সতর্ক করেছেন যে, যেসব মজলিশে আল্লাহর জিকির ও নবীর ওপর দরুদ পড়া হয় না, কেয়ামতের দিন সেই মজলিশ তাদের জন্য চরম আফসোস ও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
পার্থিব ধোঁকা, অতিরিক্ত ধন-সম্পদ কিংবা সন্তান-সন্ততির প্রতি মোহ মানুষকে রবের স্মরণ থেকে উদাসীন করে তোলে। ফলে মানুষ আখেরাতের আসল মূলধন হারিয়ে চূড়ান্ত ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সুরা মুনাফিকুনের ৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন করতে না পারে। আর যারা এমন করবে, তারাই চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত।’ আল্লাহর স্মরণ ত্যাগ করাকে একটি জীবন্ত রুহের জন্য আত্মঘাতী আখ্যা দিয়ে লেখক উল্লেখ করেন, জিকিরহীন অন্তর নির্জন ও শুষ্ক ভূমির মতো। তাই যাবতীয় ব্যস্ততার মাঝে সর্বদা রবের স্মরণে মুখর থাকার মাধ্যমেই কেবল দুনিয়ায় আত্মিক স্থৈর্য এবং পরকালে স্থায়ী মুক্তি অর্জন করা সম্ভব।





