স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য বাংলাদেশকে আরও তিন বছর সময় দিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ)। একই সঙ্গে নেপালও অতিরিক্ত তিন বছর সময় পেয়েছে। নিউইয়র্কে আজ শুক্রবার অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উত্তরণের আগে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও নেপাল সরকার অতিরিক্ত সময়ের আবেদন জানিয়েছিল।
চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের দুই দিনের মাথায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (ইউএনসিডিপি) কাছে সময় বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ফেব্রুয়ারিতে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইউএনসিডিপির ২৮তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে একটি প্যানেল গঠন করা হয়। পরবর্তীকালে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনার জন্য সাধারণ পরিষদে সুপারিশ করে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর আবেদন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এই আবেদনে জি-৭৭ভুক্ত দেশগুলো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সমর্থন জানিয়েছে।
জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশ ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিন বছরের বর্ধিত প্রস্তুতিকাল পেল। সংস্থাটি বাংলাদেশের সামনে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর কথা স্বীকার করেছে। সাম্প্রতিক সংঘাত এবং এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সৃষ্ট বিঘ্নের কারণে অনিশ্চিত মাত্রার ঝুঁকি বেড়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, সাম্প্রতিক অভিঘাতের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং দেশের অভ্যন্তরীণ দীর্ঘদিনের দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও ইউএনসিডিপির বিদ্যমান কাঠামোয় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনকে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না, তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের জটিলতা ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ বলেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় বহিরাগত অভিঘাতের প্রভাব বাড়িয়ে দেয় এবং এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে।
এই বর্ধিত সময়ে বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে। এই অগ্রগতির তথ্য নিয়মিত ইউএনসিডিপিকে জানাতে হবে। তিন বছর সময় বাড়ায় বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে গড়ে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঝুঁকি আপাতত কাটল। বর্তমানে বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে ৩৮টি দেশ ও বাণিজ্য জোটে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে, যা দেশের মোট রপ্তানির ৭৩ শতাংশ।
মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক (ইভিআই)—এই তিনটি মানদণ্ড পূরণ করায় চলতি বছর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা ছিল। ২০১৮ সালের পর জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনাতেই বাংলাদেশ তিনটি মানদণ্ড পূরণ করে। এর আগে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বাংলাদেশকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য দুই বছর অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) উত্তরণের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৩০৭ ডলার, যেখানে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই ছিল ২ হাজার ৬৮৪ ডলার। একই পর্যালোচনায় মানবসম্পদ সূচকের (এইচএআই) ন্যূনতম মান ৫৯ দশমিক ৬ নির্ধারিত থাকলেও বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৭৭ দশমিক ৫। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের (ইভিআই) সীমা ৪০ দশমিক ৬ হলেও বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২১ দশমিক ৯।
সবকটি মানদণ্ড পূরণ করলেও উত্তরণ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং অর্জিত উন্নয়ন ধরে রাখাই বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের বৃহত্তম এলডিসি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে জটিল। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হচ্ছে, যা কয়েক দশকের উন্নয়ন অগ্রগতিকে চাপে ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২১ সালের ২২ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ইউএনসিডিপির দ্বিতীয় ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় বাংলাদেশকে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়। এর আগে ২০১৮ সালের মার্চে প্রথমবারের মতো দেশটি উত্তরণের তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করেছিল। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের জন্য একটি দেশকে অন্তত দুটি মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যে তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করেছে। তবে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের পরও পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় এ অবস্থান ধরে রাখতে হয়। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় ছিল ১ হাজার ৮২৭ ডলার, যা জাতিসংঘ নির্ধারিত ১ হাজার ২২২ ডলারের সীমার চেয়ে বেশি ছিল। মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৭৫ দশমিক ৩, যেখানে সীমা ছিল ৬৬। আর অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৭ দশমিক ৩, যা উত্তরণের জন্য নির্ধারিত ৩২-এর সীমার নিচে ছিল।





