লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে ফুটবলের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ রাতে সব আলো কেড়ে নিলেন ৩৩ বছর বয়সী ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন। নিজের জন্মস্থান লেইটনস্টন থেকে মাত্র ৯ মাইল দূরের এই মঞ্চেই তাঁর মাথায় উঠল ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মানের মুকুট—ব্যালন ডি’অর। নয় বছর আগে ২০১৭ সালের ফিফা বেস্ট অ্যাওয়ার্ডের রাতে একই থিয়েটারে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, নেইমার ও সের্হিও রামোসদের দূর থেকে দেখা সেই আক্ষেপভরা তরুণের মাথায় অবশেষে উঠল শ্রেষ্ঠত্বের রাজমুকুট।
মাইকেল ওয়েন ২০০১ সালে ব্যালন ডি’অর জেতার পর দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে এই ট্রফির অপেক্ষায় ছিল ইংল্যান্ড। ওয়েন যখন এই সম্মান পেয়েছিলেন, তখন আট বছর বয়সী কেইন কেবল ফুটবলে হাতেখড়ি নিচ্ছিলেন। ম্যাথুস, ববি চার্লটন, কেভিন কিগান ও মাইকেল ওয়েনের পর ইংল্যান্ডের পঞ্চম ফুটবলার হিসেবে ইতিহাস গড়ে এই তালিকায় নাম লেখালেন তিনি। লাল গালিচায় সঞ্চালকদের মুখে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘স্যার হ্যারি কেইন’ ডাক ভেসে উঠলেও, যুক্তরাজ্যের আনুষ্ঠানিক নাইটহুড পাওয়ার আগেই ইংলিশ ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে তিনি সেই মর্যাদা পেয়ে গেছেন।
কেইনের এই চূড়ায় পৌঁছানোর পথটি রূপকথাকেও হার মানায়, যেখানে জাদুর বদলে ছিল শুধুই কঠোর পরিশ্রম ও প্রত্যাখ্যান পেরিয়ে আসার লড়াই। শৈশবে আর্সেনালের বয়সভিত্তিক দল থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল ‘অ্যাথলেটিক’ না হওয়া এবং কিছুটা ‘মোটাসোটা’ হওয়ার অজুহাতে। সেখান থেকে টটেনহাম হটস্পারে দীর্ঘ ১৯ বছরের ক্যারিয়ারে রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়েছেন, গোল করেছেন অগণিত; কিন্তু কোনো দলীয় ট্রফি না থাকায় তাঁকে শুনতে হয়েছে ‘লুজার’ বিদ্রূপ। ট্রফির খরা কাটাতে ২০২৩ সালে জন্মভূমি ছেড়ে জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখে পাড়ি জমান তিনি। বায়ার্ন ও জাতীয় দল ইংল্যান্ডের হয়ে গত মৌসুমে ৬৫ ম্যাচে ৭৩ গোল করেন কেইন। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে এক মৌসুমে এর চেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড কেবল লিওনেল মেসিরই রয়েছে।
পুরস্কার প্রদানের মঞ্চে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও যখন কেইনের নাম ঘোষণা করেন, তখন আবেগাপ্লুত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি কেইনকে ‘পরিশ্রম ও প্রতিভার সংমিশ্রণের নিখুঁত উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যা দেন। এর আগে লাল গালিচায় এক সঞ্চালক তাঁকে ‘সত্যিকারের ভদ্রলোক’ বললে উপস্থিত ইতালিয়ান সাংবাদিক ফ্যাব্রিজিও রোমানো মাথা ঝুঁকিয়ে তা সমর্থন করেন।
পুরস্কার হাতে নিয়ে বিনয়ী কেইন ট্রফি না জেতার কারণে বিদ্রূপ সহা পুরোনো ক্লাব টটেনহাম এবং ক্যারিয়ারের সব কোচের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘অনেকেই এটা ভাবেননি, এমনকি আমিও ভাবিনি যে এতটা পথ আসতে পারব। ক্যারিয়ারের শুরুতে অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। এই ঘরে থাকা অনেকের মতো আমি জন্মগত সুপারস্টার ছিলাম না। কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে, সময় লেগেছে এবং নিজের বিশ্বাস ধরে রাখতে হয়েছে।’ বক্তব্য দেওয়ার একপর্যায়ে পরিবার ও বন্ধুদের কথা বলতে গিয়ে কেইনের গলা ধরে এলেও তিনি নিজ সংযম বজায় রেখে সতীর্থ, ভক্ত, প্রতিদ্বন্দ্বী ও ভোটদাতাদের ধন্যবাদ জানান এবং অন্য সকল মনোনীতদের অভিনন্দন জানান।
৭০ বছর পূর্তির এই ঐতিহাসিক ব্যালন ডি’অর আয়োজনে ১৯৫৬ সালে প্রথম বিজয়ী ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথুসের স্মৃতিও প্রদর্শন করা হয়। কেইনের এই ঐতিহাসিক রাতের পাশাপাশি স্প্যানিশ ফুটবলারদের জয়জয়কার দেখা গেছে পুরো আয়োজনে। আটটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হয়েছেন স্প্যানিশরা। মেয়েদের বিভাগে টানা ষষ্ঠবারের মতো স্পেনে গেছে ব্যালন ডি’অর; এবার তা জিতেছেন অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস। এটি তাঁর তৃতীয় ব্যালন ডি’অর, যার মাধ্যমে তিনি আইতানা বোনমাতির সর্বোচ্চ তিনবার জয়ের রেকর্ডে ভাগ বসালেন।
স্পেনের উদীয়মান তারকা লামিনে ইয়ামাল টানা তৃতীয়বারের মতো সেরা তরুণ খেলোড়ার (কোপা ট্রফি) পুরস্কার জেতেন। স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতানো কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে পুরুষ দলের সেরা কোচের সম্মাননা পান, যা নিতে মঞ্চে উঠলে দর্শকেরা হাততালিতে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। বর্ষসেরা পুরুষ ক্লাবের পুরস্কার নেয় পিএসজি, ক্লাবের পক্ষে ট্রফি গ্রহণ করেন উসমান দেম্বেলে।
পুরো সন্ধ্যার সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত উপহার দেন ইংল্যান্ডের বুকায়ো সাকা। মানবহিতকর কাজে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি পান সক্রেটিস ট্রফি। মঞ্চে উঠে সাকা রুয়ান্ডার ১৪ বছর বয়সী দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে থাকা এক শিশুর চিঠি পড়ে শোনান, যে সাকার দাতব্য সংস্থার সহায়তায় চোখের আলো ফিরে পেয়ে এখন ইংরেজির শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।





