ঢাকার গণপরিবহনে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা মেট্রোরেলে এ পর্যন্ত ৩১ কোটির বেশি যাত্রী যাতায়াত করেছেন। যাত্রী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিকিট বিক্রি থেকে আয় বাড়লেও সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে পরিচালন ব্যয় ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রেনের সংখ্যা ও চলাচলের সময় বাড়ানোর পাশাপাশি টিকিটের বাইরে অন্যান্য উৎস থেকে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।
ডিএমটিসিএলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত মেট্রোরেলে মোট ৩১ কোটি ৩৫ লাখ ৪৬ হাজার ৩০৬ জন যাত্রী যাতায়াত করেছেন। চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর এক দিনে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৭৫৬ জন যাত্রী যাতায়াত করেন, যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড। এছাড়া গত কয়েক মাসে গড়ে প্রতিদিন সাড়ে চার লাখের বেশি যাত্রী যাতায়াত করছেন। এর মধ্যে ১৩ সেপ্টেম্বর ৪ লাখ ৮০ হাজার ও ২০ আগস্ট ৪ লাখ ৭৮ হাজার ২৮০ জন যাত্রী যাতায়াত করেছেন। এছাড়া ১৪ সেপ্টেম্বর ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮১৫ জন এবং ২১ মে ৪ লাখ ৭৪ thousand ৬৩৫ জন যাত্রী যাতায়াত করেছেন। প্রকল্প নেওয়ার সময় দৈনিক ৫ লাখ যাত্রী যাতায়াতের যে প্রাক্কলন করা হয়েছিল, বর্তমান যাত্রীসংখ্যা প্রায় তার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোর মধ্যে মতিঝিল স্টেশনে সবচেয়ে বেশি যাত্রী ওঠানামা করেন। এই স্টেশনে প্রতিদিন গড়ে ৫১ হাজার ৫৪২ জন যাত্রী প্রবেশ করেন এবং ৫১ হাজার ৩৬ জন বের হন। অফিসপাড়া, সচিবালয় ও আশপাশের বাণিজ্যিক এলাকার কারণে এই স্টেশনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে। এছাড়া উত্তরা উত্তর, পল্লবী, মিরপুর-১০, কারওয়ান বাজার ও সচিবালয় স্টেশনেও যাত্রীদের ভিড় থাকে সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে উত্তরা দক্ষিণ, বিজয় সরণি ও উত্তরা সেন্ট্রাল স্টেশনে যাত্রী তুলনামূলক কম, কারণ এসব এলাকায় লোকালয় কিছুটা দূরে অবস্থিত।
উত্তরার দিয়াবাড়ীর বাসিন্দা ও ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের টেকনোলজিস্ট কামাল হোসেন প্রতিদিন সকাল ৮টায় মেট্রোরেলে যাতায়াত করেন। তিনি জানান, শুরুর স্টেশন হওয়ায় তিনি আসন পান এবং সহজেই আধা ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে নেমে অফিসে চলে যান। একইভাবে বিকেলে নিরাপদে বাসায় ফেরেন। তবে মাঝখানের স্টেশনগুলো থেকে যাত্রীদের বেশ গাদাগাদি করে যাতায়াত করতে হয়।
২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশে এবং ২০২৩ সালের ৪ নভেম্বর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশে মেট্রোরেল চালু হয়। ২০২৩ সালের শেষ দিন থেকে পুরো পথে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। বর্তমানে এটি উত্তরা, মিরপুর, ফার্মগেট, শাহবাগ ও মতিঝিলের যাতায়াতকারীদের অন্যতম প্রধান বাহন। সময় বাঁচানো এবং যানজট এড়িয়ে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধার কারণে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
যাত্রী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিকিট বিক্রির আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আংশিক চালুর সময়ে আয় হয়েছিল ২২ কোটি টাকার বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৪৪ কোটি টাকায়। আর সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনিরীক্ষিত আয়ের পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। তবে এই বিপুল আয়ের বিপরীতে বড় অঙ্কের ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ রয়েছে। এমআরটি-৬ প্রকল্পে জাইকার কাছ থেকে পাঁচটি ঋণচুক্তির মাধ্যমে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে, যা সুদসহ আগামী ৩০ বছরে পরিশোধ করতে হবে। ২০২৩ সালের জুন থেকে সীমিত আকারে কিস্তি দেওয়া শুরু হয়েছে এবং ২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি (বছরে গড়ে প্রায় ৭৪০ কোটি টাকা) কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তন হলে টাকার হিসেবে কিস্তির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
মেট্রোরেল নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা, যার প্রায় ৫৯ শতাংশ জাইকার ঋণ। নির্মাণ ব্যয় বেশি হওয়ায় ভাড়া বাড়িয়ে আয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। বর্তমানে মেট্রোরেলে ভ্যাটও মওকুফ রয়েছে। এছাড়া গত অর্থবছরে বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে ১০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাত থেকে ডিএমটিসিএলের ওপর আসায় পরিচালন ব্যয় আরও বাড়বে।
এই অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে ট্রেনের সংখ্যা ও চলাচলের সময় বাড়িয়ে টিকিট বিক্রি থেকে বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিএমটিসিএলের পরিচালক (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) মো. নজরুল ইসলাম জানান, প্রয়োজনীয় লোকবল পাওয়া গেছে। এখন পর্যায়ক্রমে রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ানো হবে এবং দুই ট্রেনের মাঝখানের বিরতি বা হেডওয়ে কমানো হবে। বর্তমানে সাড়ে তিন মিনিট পরপর ট্রেন চালানোর সক্ষমতা থাকলেও লোকবল সংকটে তা পুরোপুরি করা যায়নি।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক মনে করেন, মেট্রোরেলের সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা উচিত। তিনি বলেন, ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে চালুর তিন বছর পর সক্ষমতার শতভাগ ব্যবহার করা প্রয়োজন। রাতে ও ছুটির দিনেও ট্রেন চলাচল বাড়ানো উচিত এবং সেই সঙ্গে অযৌক্তিক খরচ কমাতে হবে। ডিএমটিসিএল টিকিট ছাড়াও স্টেশনের অব্যবহৃত জায়গায় দোকান বরাদ্দ, গাড়ি পার্কিং ও বাণিজ্যিক জায়গা ব্যবহারের মাধ্যমে অতিরিক্ত আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
বর্তমানে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এই বর্ধিত অংশ চালু হলে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। কমলাপুর স্টেশন চালু হলে দেশের মূল রেলওয়ে ব্যবস্থার সঙ্গে মেট্রোরেলের সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে, যা যাত্রী ও আয় উভয়ই অনেক বাড়িয়ে দেবে। তখন আর্থিক চিত্রটি আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এখন সেই বাড়তি যাত্রীর মাধ্যমে আয় কতটা বাড়ানো যায় এবং একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় ও ঋণের কিস্তি কীভাবে সামাল দেওয়া যায়, সেটিই হবে মেট্রোরেল পরিচালনার পরবর্তী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।.২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার মেট্রোরেল-মনোরেল নয়, আধুনিক ৭০০ বাসেই ভরসা.ঢাকায় আরও দুই রুটে মেট্রোরেল, ব্যয় দুই লাখ কোটি টাকার বেশি




