উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত ঢাকার অধিকাংশ রাস্তা সন্ধ্যার পর অন্ধকারে ডুবে থাকত। তখন ঘরবাড়ি আলোকিত করার প্রধান ভরসা ছিল মোমবাতি ও কেরোসিনের বাতি। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে কিছু গ্যাসের বাতি থাকলেও তা ছিল অপর্যাপ্ত। এমন এক প্রেক্ষাপটে ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকায় প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলে ওঠার ঘটনাটি ছিল এক অভাবনীয় পরিবর্তন।
ঐদিন বিকেলে আহসান মঞ্জিলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রাজস্ব বোর্ডের সচিব সি ডব্লিউ বোল্টন সুইচ টিপে এই আলোর নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। নবাব আহসানউল্লাহর আমন্ত্রণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বাংলার ছোট লাট স্যার জন উডবার্নের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও অসুস্থতার কারণে তিনি আসতে পারেননি। এই উদ্যোগের পেছনে নবাব আহসানউল্লাহর লক্ষ্য ছিল নগরবাসীর দুর্দশা লাঘব, শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা। এর জন্য তিনি প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যয় করেছিলেন।
পরদিন ৮ ডিসেম্বর ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকায় এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের ‘ঢাকাসমগ্র ১’ বইয়ে ওই প্রতিবেদনের বরাতে লেখা হয়, ‘গতকল্য সন্ধ্যার অব্যবহিত পরে, শ্রীযুক্ত নবাব বাহাদুরের অনুকম্পায় ঢাকা নগরীর প্রধান প্রধান রাস্তাগুলি চপলা চমকে অকস্মাৎ হাসিয়া উঠিয়াছে…ঢাকার ন্যায় শহরে এরূপ দৃশ্য লোকনয়নে নিপতিত হইবে দশ বৎসর পূর্বে বোধ হয় তাহা স্বপ্নের অগোচর ছিল কিন্তু নবাব বাহাদুরের অপার অনুগ্রহে অসম্ভবও সম্ভব হইয়াছে।’
আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের ২০ নম্বর গ্যালারিতে সেই সময়ের বৈদ্যুতিক বাতি, পাখা, মিটার, কেটলি এবং পুরোনো দিনের কেরোসিনের বাতি, সংকেতবাতি ও কেরোসিনচালিত পাখা সংরক্ষিত রয়েছে। সেখানে সেদিনের ঘটনা নিয়ে আঁকা একটি কাল্পনিক তৈলচিত্রও রয়েছে।
বিদ্যুৎ চালুর এই পরিকল্পনাটি ছিল নবাব আহসানউল্লাহর দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতির অংশ। ১৮৮৭ সালে তাঁর বাবা নবাব খাজা আবদুল গণি ‘নাইট কমান্ডার অব দ্য স্টার অব ইন্ডিয়া’ (কেসিএসআই) উপাধি পেলে নবাব আহসানউল্লাহ ঢাকাবাসীকে আনন্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কলকাতার সংবাদপত্র ‘ইংলিশম্যান’-এ প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, তিনি নিজের খরচে তেলের বাতির বদলে গ্যাসের বাতি স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তবে শর্ত ছিল মিউনিসিপ্যালিটিকে পয়োনিষ্কাশন ও দমকলের ব্যবস্থা করতে হবে। ১৮৮৮ সালে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড ডাফরিন ঢাকা সফরে এলে গ্যাসের বাতি স্থাপনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। ১৮৯১ সালে নবাবের আইনবিষয়ক সচিব জি এল গার্থ মিউনিসিপ্যালিটির কাছে স্মারকলিপি দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে নবাব সরাসরি বিদ্যুতের বাতি স্থাপনের উদ্যোগ নেন।
১৯০১ সালে ‘দ্য ঢাকা ইলেকট্রিক লাইট ট্রাস্ট’ গঠনের মাধ্যমে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যায়। ট্রাস্টের তহবিলে নবাব সাড়ে চার লাখ টাকা দান করেন এবং ৫ জুলাই লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী রহমতগঞ্জ, চকবাজার, মোগলটুলী, নালগোলা, বাবুবাজার, কমিটিগঞ্জ, ইসলামপুর, আহসান মঞ্জিল, পাটুয়াটুলী, বাংলাবাজার, ফরাশগঞ্জ, লক্ষ্মীবাজার, সদরঘাট, শাঁখারীবাজার, জনসন রোড, নবাবপুর, ভিক্টোরিয়া পার্ক ও রেলওয়ে স্টাফ কোয়ার্টার রোড বিদ্যুতের আওতায় আসার কথা ছিল।
উদ্বোধনের মাত্র ৯ দিন পর, ১৯০১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নবাব আহসানউল্লাহ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সৈয়দ আবুল মকসুদের ‘নবাব সলিমুল্লাহ ও তাঁর সময়’ বইয়ে উল্লেখ আছে, তিনি বিষয়সম্পত্তি নিয়ে মানসিক চাপে ছিলেন এবং হৃদ্রোগে ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে পূর্ববঙ্গে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, ইংল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেসার্স অক্টাভিয়াস স্টিল অ্যান্ড কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের কাজে যুক্ত হয় এবং হাতিরপুল এলাকায় উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করে। ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির অঙ্গসংগঠন হিসেবে ডেভকোর আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি পরীবাগে ছয় মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ধানমন্ডি পাওয়ার হাউস স্থাপন করে। তবে ঢাকায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের আগেও গাজীপুরের ভাওয়াল পরগনার রাজা বিলাত থেকে আনা জেনারেটরের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছিলেন। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়–ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, ৯৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।





