ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর-বিরোধী দাবিতে রাজধানী দিল্লিতে ‘পিপলস মার্চ’ কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। শুক্রবার বিকেলে কনট প্লেসের কাছে গোল ডাকখানা ও বাংলা সাহেব গুরুদ্বারের সামনে জড়ো হয়ে নির্বাচন কমিশন অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন কয়েক শ আন্দোলনকারী। সেখানে বাধা পাওয়ার পর রাস্তায় বসে অবস্থান নিলে পুলিশ শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করে ভ্যান ও বাসে তুলে নিয়ে যায়।
বিভিন্ন বামপন্থী দল, কৃষক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের আহ্বানে আয়োজিত এই বিক্ষোভে সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে, আইসা নেত্রী নেহা বোরা এবং ‘ইন্ডিয়া’ জোটসহ সাধারণ মানুষকে অংশগ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের অর্থনীতিবিদ স্বামী পরকলা প্রভাকরও ‘জ্ঞানেশ হটাও’ অভিযানে শামিল হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তবে কর্মসূচির দিন পরকলা প্রভাকর ছাড়াও দক্ষিণি তারকা প্রকাশ রাজ, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, কৃষক নেতা রাকেশ টিকায়েত, মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী, ছাত্রনেতা ঐশী ঘোষ, অভিজিৎ দিপকে ও নেহা বোরার মতো ঘোষিত অধিকাংশ বিশিষ্ট মুখই অনুপস্থিত ছিলেন।
অনুপস্থিতির মধ্যেও মিছিলে উপস্থিত কর্মীদের উৎসাহে কমতি ছিল না। সিপিএমের বৃন্দা কারাত, সিপিআইয়ের অ্যানি রাজা, আন্দোলনকর্মী যোগেন্দ্র যাদব ও অঞ্জলি ভরদ্বাজের সঙ্গে সংযুক্ত কিষান মোর্চা এবং যুব ছাত্র সমাজের সহস্রাধিক সমর্থক কর্মসূচিতে অংশ নেন। আয়োজকেরা আগেই জানিয়েছিলেন, তাঁরা কোনো পুলিশি অনুমতি নেবেন না এবং শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের দিকে এগোবেন। পুলিশ বাধা দিলে কোনো হিংসাত্মক আচরণ না করে রাস্তায় বসে পড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তাঁরা।
ঘোষণা অনুযায়ী বাংলা সাহেব গুরুদ্বার ও গোল ডাকখানা থেকে অশোক রোড ধরে এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নির্বাচন কমিশনের মূল দপ্তরের দিকে এগোতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। অশোক রোডে আগেই ব্যারিকেড বসিয়েছিল পুলিশ। সেখানে আধা সামরিক বাহিনী, র্যাফ, নারী পুলিশের পাশাপাশি জলকামানের গাড়ি রাখা হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলপ্রয়োগ করতে হয়নি। পুলিশ সদস্যরা দাঙ্গা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে বিক্ষোভকারীদের পাশাপাশি হেঁটে যান। আন্দোলনকারীরা জ্ঞানেশ কুমার বিরোধী ও এসআইআর-বিরোধী স্লোগানের পাশাপাশি ‘ভোট চোর গদ্দি ছোড়’ বলে আওয়াজ তোলেন এবং বিভিন্ন পোস্টার প্রদর্শন করেন।
ব্যারিকেডের সামনে এসে বিক্ষোভকারীরা থেমে গেলে দিল্লি পুলিশের কর্তারা লাউডস্পিকারে হুঁশিয়ারি দিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার বরণ করতে অনুরোধ করেন। এরপর পূর্বঘোষণা অনুযায়ী আন্দোলনকারীরা রাস্তায় বসে পড়েন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এই লড়াই কেবল যন্তর মন্তর পুনরুদ্ধারের নয়, এটি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সন্ধ্যায় পুলিশ সূত্রে জানানো হয়, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করতে ওই স্থান থেকে শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।
একই সময়ে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস ও অজিঙ্ক শিন্ডে মন্দির মার্গ থানায় উপস্থিত হন। গত বুধবার রাতে তিহার জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ বৃহস্পতিবার তাঁদের হাজিরার নির্দেশ দিয়েছিল। তবে সময় চেয়ে নিয়ে তাঁরা শুক্রবার থানায় যান। সিজেপি নেতা সৌরভ সংবাদমাধ্যমকে জানান, ক্রাইম ব্রাঞ্চে পরবর্তীতে কবে দেখা করতে বলা হবে তার ওপর ভিত্তি করেই তাঁরা তাঁদের পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করবেন। এর আগে সিজেপি নেতা অভিজিৎ কর্মী-সমর্থকদের উৎসবের মৌসুমে পরিবারের সঙ্গে থাকার পরামর্শ দেওয়ায় ধারণা করা হচ্ছিল, দীপাবলি পর্যন্ত নতুন আন্দোলন স্থগিত রাখা হচ্ছে।
এদিকে দিল্লির বিক্ষোভের দিনেই তামিলনাড়ুতে এসআইআর ইস্যুতে রাজ্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনার অর্চনা পট্টনায়কের ডাকা সর্বদলীয় বৈঠক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেখান থেকে ক্ষমতাসীন টিভিকে ও তাদের জোট সঙ্গীদের পাশাপাশি বিরোধী দল ডিএমকের প্রতিনিধিরা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে ওয়াক আউট করেন। সম্প্রতি চেন্নাইয়েও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও এসআইআর বাতিল চেয়ে বিশাল মিছিল হয়েছিল। এমনকি বিজেপি ছেড়ে আসা সাবেক রাজ্য সভাপতি আন্নামালাই তাঁর নতুন দল ‘উই দ্য লিডার্স’ গঠন করে জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা দাবি করেন এবং সিজেপির ন্যায়সংগত আন্দোলনে সমর্থন ঘোষণা করেন।
তামিলনাড়ু সরকারের টিভিকে মন্ত্রিসভার সদস্য নির্মল কুমার জানিয়েছেন, শুরু থেকেই তাঁরা এই এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে আসছেন। তাঁর দাবি, এই ব্যবস্থা না থাকলে তামিলনাড়ু বিধানসভার ২৩৪টি আসনের মধ্যে টিভিকে ১৬০টি আসনে জয়ী হতে পারত, যেখানে তারা ১০৮টি আসনে জয় পেয়েছে।





