ক্ষমতায় না থাকলেও কেন আওয়ামী লীগের ক্ষোভের কেন্দ্রে ড. ইউনূস

Published: October 16, 2026, 4:18 am

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব ছেড়ে আট মাসের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে রয়েছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ারও কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ তাঁর মধ্যে নেই। তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে একদম তৃণমূলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছেন তিনি। গত ১২ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুইলচেয়ারে থাকা ড. ইউনূসকে ঘিরে যে হেনস্তার ঘটনা ঘটে এবং এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতির বিতর্কিত মন্তব্য সেই ক্ষোভকে নতুন করে সামনে এনেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রে না থেকেও কেন তিনি দলটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ড. ইউনূসকে ঘিরে আওয়ামী লীগের এই বিরোধিতা বা ক্ষোভকে কেবল ব্যক্তিগত তিক্ততা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ব্যাপক প্রাণহানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারিক প্রক্রিয়া, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত এবং দলটির ভবিষ্যত অনিশ্চয়তার সঙ্গে এটি সরাসরি জড়িত। এসব কারণে আওয়ামী লীগের কাছে তিনি এমন এক সময়ের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, যখন দলটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে কঠোর চাপের মুখে পড়ে।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার জানান, সামগ্রিকভাবে কয়েকটি বড় কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রথমত, ২০২৪ সালে ক্ষমতার পালাবদল। দ্বিতীয়ত, জুলাই-আগস্টের ঘটনা নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিবেদন ও এর মাধ্যমে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক জবাবদিহির চাপ। তৃতীয়ত, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ও নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা। চতুর্থত, শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া ও দলটির রাজনীতিতে ফিরে আসার অনিশ্চয়তা। এর পাশাপাশি গ্রামীণ ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ এবং অতীতে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে নেওয়া মামলা ঘিরে শেখ হাসিনার পুরনো সংঘাতও এই প্রেক্ষাপটে প্রভাব ফেলছে। ক্ষমতাচ্যুতির পর আওয়ামী লীগের সামনে এখন নেতৃত্ব, সংগঠন ও রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ড. ইউনূস এমন এক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ছিলেন যার সময়ে এই সংকটগুলো উন্মোচিত হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের জন্য এই রূপান্তর ছিল এক বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়। দলটির সমর্থকদের অনেকেই মনে করেন, তাঁর সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার পথ কঠিন করে তুলেছে। তবে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে দেখা যায়, শেখ হাসিনার পতনের পেছনে কোনো একক ব্যক্তি দায়ী ছিলেন না; বরং বছরের পর বছর ধরে চলা দমনপীড়ন, রাজনৈতিক অসন্তোষ, গণআন্দোলন এবং সহিংসতা দমনে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলপ্রয়োগের যৌথ ফলেই ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছিল। তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের দলীয় প্রচারণায় ড. ইউনূসই মূল প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছেন।

দলটির নেতা-কর্মীদের ক্ষোভের পেছনে বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট কারণ আন্তর্জাতিকভাবেও যুক্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের অভিযোগ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সরে দাঁড়াতে বাধ্য হওয়ার পেছনে ইউনূস সরকারের ভূমিকা ছিল। পুতুলের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ ড. ইউনূসের সরকার গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছিল বলে তাদের বিশ্বাস। একই সঙ্গে শেখ রেহানার কন্যা ও ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমে আসার পর ইউনূস সরকার তাতে প্রয়োজনীয় সঙ্গত দিয়েছিল, যার পরিণতিতে টিউলিপকে তাঁর মন্ত্রী পদ ছাড়তে হয়। এ ছাড়া শেখ হাসিনা ও দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরতে ইউনূস সরকারের সোচ্চার ভূমিকাও আওয়ামী লীগকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে।

সর্বশেষ বড় ধাক্কাটি আসে জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের প্রতিবেদনের মাধ্যমে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতা দমন, নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে হওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয়। এই আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পথে শক্ত বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দলটির সমর্থকদের দাবি, ইউনূস সরকার জাতিসংঘের এই তদন্তকে বিশেষ প্রাধান্য দিয়ে তাদের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিমত, কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধের আন্তর্জাতিক তদন্ত এবং নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা মানবাধিকার ও আইনের শাসনের মূল ভিত্তি।

আরেকটি বড় সংঘাতময় অধ্যায় উন্মোচিত হয় ২০২৫ সালের মে মাসে, যখন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সার্বিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে দলটির সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ গভীর অনিশ্চয়তায় পড়ে। আওয়ামী লীগ এটিকে রাজনৈতিক অধিকার হরণের ঘটনা হিসেবে আখ্যা দিলেও সরকারের অবস্থান ছিল জুলাই-আগস্টে সংঘটিত অপরাধের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। দলটির বড় অংশ মনে করে, গ্রেপ্তার, আইনি বিচার এবং নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার মূল কারিগর ড. ইউনূসই।

এই রাজনৈতিক সংঘাতের শিকড় অবশ্য ২০২৪ সালের আগের পুরনো ঘটনায়ও বিস্তৃত। গ্রামীণ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা পদ্ধতি এবং ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি নিয়ে সরকারের সঙ্গে ড. ইউনূসের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে শ্রম আইন লঙ্ঘনের একটি মামলায় তাঁকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যেটিকে তিনি এবং তাঁর সমর্থকরা রাজনৈতিক হয়রানি বলে অভিহিত করেছিলেন। পুরনো সেই বিরোধই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরও তীব্র রূপ ধারণ করে।

যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত ১২ অক্টোবর নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে। সেদিন হুইলচেয়ারে থাকা ড. ইউনূসকে লক্ষ্য করে একদল আক্রমণাত্মক লোক 'সন্ত্রাসী' বলে চিৎকার করে ও হেনস্তা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই ঘটনার তদন্তে নিউইয়র্ক আওয়ামী লীগ ও যুক্তরাষ্ট্র যুবলীগের কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততা সামনে আসে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এ ঘটনার কঠোর নিন্দা জানিয়ে বলেন, এই ধরনের হেনস্তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও অন্তর্বর্তী সরকারের ১২ জন সাবেক উপদেষ্টা পৃথক বিবৃতিতে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান এবং রাজনৈতিক বিরোধ বজায় থাকলেও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার ওপর জোর দেন।

তবে এই ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমানের একটি বক্তব্যে। নিউইয়র্কের টাইম টেলিভিশনের একটি টকশোতে অংশ নিয়ে তিনি হেনস্তার ঘটনা সমর্থন করার ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, এটি ঘটতেই থাকবে এবং তা কেবল শুরু। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইউনূস সরকারের আমলে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা, নিষেধাজ্ঞা এবং গ্রেপ্তারের কারণেই নেতা-কর্মীদের মধ্যে মারাত্মক ক্ষোভ জমেছে। সিদ্দিকুর রহমানের এই মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম সমালোচিত হলেও এটি পরিষ্কার করে দেয় যে, দলটির একটি অংশ ড. ইউনূসকেই তাদের বর্তমান রাজনৈতিক বিপর্যয় ও অনিশ্চয়তার প্রধান প্রতীক মনে করে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin