উপাচার্যের চেয়ারে ছাত্ররাজনীতির ছায়া: কেন বদলায় না বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র?

Published: October 13, 2026, 9:45 am

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত সহ–উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষকে শপথ পাঠ করিয়েছিলেন তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও শিক্ষার্থীরা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যাপক ইয়াহ্‌ইয়া আখতারের কার্যালয়ে গত বছরের ৫ জুলাই ইসলামী ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতা গিয়ে হট্টগোল করেন। সে সময় তাঁদের বলতে শোনা যায়, ‘আপনি নিজ যোগ্যতায় (উপাচার্য পদে) বসেননি, আপনাকে আমরা বসিয়েছি, আপনি আমাদের কথা শুনতে বাধ্য।’

প্রায় এক বছর পর চট্টগ্রামেরই আরেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যকে বাতিল করে আগের উপাচার্যকে বহাল রাখার দাবিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির মধ্যেই ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ক্ষমতাসীন ছাত্রদলের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তালা ভেঙে নিজের দপ্তরে প্রবেশ করেছেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম।

এই তিনটি উদাহরণ কোনো নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য নয়; বরং তিনটি ভিন্ন সংগঠন, তিনটি ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং দুটি ভিন্ন সরকারের আমলের ঘটনা হলেও চিত্রের কোনো হেরফের হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ছাত্ররাজনীতির খবরদারির কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী উপাচার্য নিয়োগ দেন আচার্য এবং তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যনির্বাহী প্রধান। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এক দল এসে উপাচার্যকে বলছে তারা বসিয়েছে, আবার অন্য দল শিক্ষার্থীদের চাওয়া–পাওয়ার বাইরে গিয়ে উপাচার্যকে চেয়ারে বসিয়ে দিচ্ছে।

উপাচার্যদের চেয়ার এতটাই কাদামাটির ওপর বসানো থাকে যে কখন সেটি দেবে যায়, তা কেউ জানে না। কয়েক দশক ধরে উপাচার্যেরা ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। যখনই উপাচার্য বিপদে পড়েন, সেটা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির আন্দোলন ঠেকানো হোক কিংবা কর্মকর্তা–কর্মচারীদের আন্দোলন সামলানো, সেই দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনগুলোকেই। বিনিময়ে উপাচার্যেরা পছন্দের ব্যক্তিদের টেন্ডার পাইয়ে দেন, শিক্ষক–কর্মকর্তা–কর্মচারী নিয়োগ দেন এবং আবাসিক হলে তাঁদের আধিপত্যের সুযোগ করে দেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই ভয়াবহ রূপ দেখা গিয়েছিল।

চুয়েটের ক্ষেত্রেও সরকার আন্দোলনরত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দাবিকে উপেক্ষা করে উপাচার্য শেখ শরীফুল আলমকে অনলাইনে যোগদান করিয়েছে, শিক্ষকদের বেতন বন্ধ করিয়েছে এবং সবশেষে ছাত্রসংগঠনের কাঁধে ভর করে তাঁকে চেয়ারে বসিয়েছে। সরকার এখানে নিজেকে গুটিয়ে রেখে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হলো ‘সরকার’, আর শিক্ষার্থীরা সেখানে ভেসে আসা কোনো উপাখ্যান। যে উপাচার্য নিজের চেয়ারের জন্য ছাত্রসংগঠনের কাছে ঋণী হচ্ছেন, তিনি পরবর্তী সময় তাদের কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নৈতিক শক্তি রাখেন না।

যেখানে উপাচার্যের চেয়ে ছাত্রনেতারা বড়, সেখানে জ্ঞানচর্চা ছোট হতে বাধ্য। চব্বিশে শিক্ষার্থীরা বৈষম্য আর দখলদারির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন। সেই আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত সম্মান হবে এমন বিশ্ববিদ্যালয় গড়া, যেখানে উপাচার্যের চেয়ার কারও দয়ায় নয়, যোগ্যতায় পাওয়া যায়। কিন্তু এবারের উপাচার্য নিয়োগে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে খেয়ালখুশিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ হওয়ায় যোগ্যতার বদলে দলীয় আনুগত্য আর রাজপথের শক্তিই সিদ্ধান্তের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার কি সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কথা শুনতে পায়? ক্ষমতায় গেলে কেন তারা বুঝতে পারে না, ছাত্রসংগঠন নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত ক্ষমতার মালিক সাধারণ শিক্ষার্থীরা?

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo