পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিবাদ ও শিক্ষার্থীদের জোরালো দাবির মুখে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং (ইসিই) বিভাগের শিল্প-উপদেষ্টা প্যানেল (আইএপি) থেকে সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদকে বাদ দেওয়া হয়েছে। শনিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত ইসিই বিভাগের এক জরুরি সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পদচ্যুত করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বিকেল ৩টায় অনুষ্ঠিত সভার তথ্য উল্লেখ করে সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদকে প্যানেল থেকে বাদ দেওয়ার অনুমোদনের কথা জানানো হলেও নির্দিষ্ট কোনো কারণ দর্শানো হয়নি।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত শুক্রবার, যখন রুয়েটের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং ইইই, ইসিই, ইটিই ও এমটিই বিভাগের সদস্যদের নিয়ে গঠিত 'রুয়েট ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (আরডিএফ)' নামের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কুরআন কোর্স সংক্রান্ত একটি বার্তা নিয়ে আলোচনার সময় সাঈদ ইমতিয়াজ বেশ কিছু বিতর্কিত মন্তব্য করেন। এতে ইসিই বিভাগের সাধারণ ও ধর্মপ্রাণ মুসলিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তার বক্তব্য শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় মৌলিক অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
অনলাইন বার্তাগুলোতে সাঈদ ইমতিয়াজ কোরআনকে 'ইশারা গ্রন্থ' হিসেবে অভিহিত করেন এবং মন্তব্য করেন যে রুয়েটের উচিত বিজ্ঞান বইয়ের পরিবর্তে ইশারা গ্রন্থ থেকে শিক্ষা দেওয়া। তিনি আরও লেখেন, কোরআন বিজ্ঞানের বই নয়, এটি নিদর্শনের বই। প্রকৌশলীদের পণ্য নকশা, উৎপাদন বৃদ্ধি, নির্মাণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কোরআনের জ্ঞান ব্যবহারের প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, এতে বিমান তৈরি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রযুক্তিগত বিপ্লব কিংবা যন্ত্র তৈরির পদ্ধতির ওপর কোনো আয়াত নেই। একই সঙ্গে কোরআনে পণ্য নকশার কথা থাকলে ঐশী গ্রন্থ হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হতো বলেও মতামত প্রকাশ করেন।
এছাড়াও, কোরআনের বিভিন্ন সংবেদনশীল আয়াতের ব্যাখায় তিনি বেশ কিছু বিব্রতকর মন্তব্য করেন বলে শিক্ষার্থীরা জানান। তিনি বার্তায় লেখেন, বাবার হাতে মাকে মার খেতে দেখে সন্তানদের কাঁদা উচিত নয়, কারণ কোরআনের ৪ নম্বর সূরার ৩৪ নম্বর আয়াতে পুরুষদের স্ত্রীদের মারধর করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৬৪ নম্বর সূরার ১৪ নম্বর আয়াতের উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, রুয়েটের শিক্ষার্থীরা যখন এই আয়াত পড়বে, তখন তারা জানতে পারবে তারা এবং তাদের মায়েরা পিতার শত্রু; তাই কোরআন পুরুষদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়। এসব মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষার্থীরা তার সদস্যপদ অবিলম্বে বাতিল এবং ভবিষ্যতে বিভাগের যেকোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কার্যক্রম থেকে তাকে দূরে রাখার জোর দাবি তোলেন।
একই সাথে বহিষ্কৃত সদস্যের বিরুদ্ধে একাডেমিক ও পাঠ্যক্রম বা কারিকুলাম সংক্রান্ত নানা হস্তক্ষেপর অভিযোগ উত্থাপন করেন শিক্ষার্থীরা। বুয়েটের ১৯৭৫ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী এবং কানাডাভিত্তিক সিগন্যাল স্ট্রিম ইনকরপোরেটেডের সভাপতি সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদ রুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী বা শিক্ষক না হওয়া সত্ত্বেও বিভাগের অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করছিলেন বলে অভিযোগ। শিক্ষার্থীদের একাংশের দাবি, তার পরামর্শে মৌলিক বিষয়গুলোর পরিবর্তে মাইক্রোকন্ট্রোলারের ওপর বাড়তি জোর দেওয়া হচ্ছিল। এমনকি ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের 'ইলেকট্রনিক শপ প্র্যাকটিস' কোর্সে এসটিএম৩২-সংক্রান্ত সেশনে উপস্থিতির ওপর ২০ শতাংশ নম্বর রাখার নিয়ম এবং থিসিসের বদলে প্রকল্প ভিত্তিক কাজকে প্রাধান্য দেওয়ার পদক্ষেপে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। একজন বহিরাগত ব্যক্তির এমন নিয়ন্ত্রণে একাডেমিক স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে বলে মনে করছিলেন তারা।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়ে ইসিই বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন জানান, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। শিল্প-উপদেষ্টা প্যানেলের ওই সদস্যের ধর্মীয় বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের আপত্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাকে ইতিমধ্যেই প্যানেল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে ল্যাব বা ওয়ার্কশপ বাধ্যতামূলক না করে ঐচ্ছিক করার বিষয়ে একমত হয়েছে বিভাগ। ল্যাব সংস্কার, প্রজেক্ট এবং অন্যান্য যৌক্তিক ও ইতিবাচক দাবি বাস্তবায়নে প্রশাসন সবসময় আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।





