গোয়েন্দা যাচাইয়ে আটকে গেল প্রাথমিকের শত শত শিক্ষকের নিয়োগ

Published: September 27, 2026, 8:10 am

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদের নিয়োগ পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েও নিয়োগপত্র পাননি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার শারীরিক প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী মো. জাহিদ হাসান। ওই উপজেলায় সুপারিশপ্রাপ্ত ৮৩ জনের মধ্যে তাঁর মেধাক্রম ছিল ৫৪তম এবং তাঁর প্রতিবন্ধী কোটাও ছিল। জাহিদ হাসান জানান, চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ার খবর শুনে তাঁর মা কাঁদতে শুরু করেছেন এবং বাবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তাঁর সন্দেহ, পুলিশ ও গোয়েন্দা ভেরিফিকেশনের নামে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। শুধু জাহিদ নন, তাঁর মতো শত শত চাকরিপ্রার্থীর ক্ষেত্রে যাচাইয়ের নামে নিয়োগ আটকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানায়, পুলিশের পাশাপাশি একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এই যাচাইয়ের কাজটি করা হয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্তদের মোর্চার দাবি, দেশের ৬১টি জেলার মধ্যে তারা ৫৫টি জেলার তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছে। সেই তথ্যানুযায়ী, বাদ পড়া প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি। উল্লেখ্য, পার্বত্য তিন জেলায় নিয়োগের প্রক্রিয়াটি জেলা পরিষদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এ ছাড়া বাকি ছয়টি জেলার নিয়োগের তালিকা শনিবার রাত নয়টা পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি প্রার্থী বাদ পড়ার এই দাবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হলেও, ১১টি জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ওই জেলাগুলোতেই বাদ পড়ার সংখ্যা ৫৫৪ জন। জেলাগুলো হলো ময়মনসিংহ, রংপুর, দিনাজপুর, ঝালকাঠি, নীলফামারী, কুষ্টিয়া, জামালপুর, মৌলভীবাজার, চাঁদপুর, নড়াইল ও সুনামগঞ্জ।

সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২০২৫-এর ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে দেশের ৬১টি জেলায় মোট ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। তাঁদের আগামী ১ অক্টোবর যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলো নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ করলে বাদ পড়া প্রার্থীদের বিষয়টি সামনে আসে। উত্তীর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের নিয়োগপত্র না পাওয়ার ক্ষোভের কথা জানান।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বা অপরাধের রেকর্ড থাকলে তাঁকে অনুপযুক্ত বিবেচনা করা যায়। কিন্তু বাস্তবে যাচাইয়ের নামে প্রার্থী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খোঁজা হয় এবং এর ভিত্তিতে ইতিবাচক বা নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের এই চর্চা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের বলেন, "এমন অন্যায়ের বিরুদ্ধেই গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল এবং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের মতো জায়গায় রাজনৈতিক বিবেচনা অত্যন্ত অশনিসংকেত।

বর্তমানে দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৭টি, যেখানে শিক্ষার্থী রয়েছে এক কোটির বেশি এবং শিক্ষকের সংখ্যা পৌনে চার লাখের মতো। বর্তমানে এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৩৬ হাজারের বেশি পদ এবং সহকারী শিক্ষকের কয়েক হাজার পদ শূন্য রয়েছে। বর্তমান নিয়োগবিধি অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদের ৮০ শতাংশ সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের একটি মামলা গত বছরের জুলাইয়ে উচ্চ আদালতের রায়ে নিষ্পত্তি হওয়ার পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানায়। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষভাগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছিল।

উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে কয়েকজন প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা না দেওয়ায় নিয়োগপত্র পাননি। যেমন, ময়মনসিংহ জেলায় চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত ২৫৯ জনের মধ্যে ২১৭ জনের নাম তালিকায় এসেছে এবং ৪২ জন বাদ পড়েছেন। ময়মনসিংহের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানান, নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় ১৮ জন নিয়োগপত্র পাননি, যারা হয়তো চাকরিতে যোগ দেবেন না। তবে এর বাইরে আরও ২৪ জন নিয়োগপত্র পাননি, যাদের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক বা বিরূপ মন্তব্য রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

নিয়োগ নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিভ্রান্তির বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে জানান, নিয়োগপত্র প্রাপ্তি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। ১ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে উত্তীর্ণ প্রার্থীরা নিয়োগপত্র না পেয়ে থাকলে পরবর্তীতে তা যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ে পর্যায়ক্রমে পাঠানো হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন বা ভেটিং একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া।

পুলিশি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মূলত নির্ধারিত ফরমে ফৌজদারি অপরাধ, রাজনৈতিক বা অন্য মামলায় গ্রেপ্তার, অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হওয়ার ইতিহাস এবং নজরবন্দী বা বহিষ্কারের বিবরণ যাচাই করা হয়। তবে এর বাইরে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়। বিগত দলীয় সরকারগুলো গোয়েন্দা প্রতিবেদন ব্যবহার করে বিরোধী মতের অনুসারী ও স্বজনদের চাকরি বঞ্চিত করে জনপ্রশাসনের দলীয়করণ করত। এই চর্চাটি ব্রিটিশ আমলে শুরু হয়েছিল মূলত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে।

সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন পদোন্নতি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয় জানার বিধান বাতিল করার সুপারিশ করেছে। কমিশন বলেছে, বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত নিয়োগের আগে শুধু ফৌজদারি মামলা আছে কি না, তা পুলিশ বিভাগের কাছে জানতে চাইবে এবং প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতিবেদন চাইতে পারে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগে পুলিশি যাচাই বাতিলেরও সুপারিশ করেছে কমিশন। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২৮তম থেকে ৪২তম বিসিএস পর্যন্ত বঞ্চিত ২৫৯ জন প্রার্থীকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে বর্তমান সরকারের সময়েও গোয়েন্দা যাচাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। যেমন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৪৩তম বিসিএসের প্রজ্ঞাপনে ২৬৭ জনকে বাদ দেওয়া হয়, যার মধ্যে ২২৭ জনের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থার বিরূপ মন্তব্য ছিল এবং বাকি ৪০ জন স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশ নেননি। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় জানায়, বাদ পড়া ২২৭ জনের পুনর্বিবেচনার আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে।

সরকারি চাকরিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া বলেন, "চাকরিতে নিয়োগ-পদোন্নতির ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন দেওয়ার আইনগত কোনো সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে পুলিশ যাচাই করতে পারে। পুলিশ যদি কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ, দাগি অপরাধী হওয়া বা এ ধরনের কোনো অপরাধের তথ্য পায়, কেবল সে ক্ষেত্রে ওই প্রার্থীকে বাদ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, অতীতেও নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে।" তিনি আরও বলেন, গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রার্থী বাদ দেওয়ার সংস্কৃতি পুরো জনপ্রশাসনকে বিশৃঙ্খল করে তোলে, যা কোনোভাবেই ভালো লক্ষণ নয়।

সহকারী শিক্ষকদের পদটি সরকারি বেতনকাঠামোর ১৩তম গ্রেডের হওয়ায় এবং শুরুতে ভাতাসহ প্রায় ৩৬ হাজার টাকা বেতন থাকায় চাকরিটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় সুপারিশ পেয়েও চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন প্রার্থীরা। দিনাজপুরের এক চাকরিপ্রার্থী নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁর বা তাঁর পরিবারের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই, তবুও কেন তাঁকে বাদ দেওয়া হলো তা তিনি বুঝতে পারছেন না। ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কারণে অন্য কোনো সরকারি চাকরি পাওয়াও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

যেমন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৪৩তম বিসিএসের ১ হাজার ৮৯৬ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo