শান্তিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই: জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস

Published: September 23, 2026, 3:28 am

বিশ্বের বর্তমান সংকটগুলোকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সূচনায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, যুদ্ধ, বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারের মতো প্রতিটি ইস্যুর পেছনেই ক্ষমতার ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি জড়িয়ে আছে। বর্তমান বিশ্ব বিভাজনের রেখাগুলো গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে, যা ছোট ফাটল থেকে এখন বিশাল খাদে পরিণত হয়েছে।

গুতেরেস বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতার তিনটি বড় পরিবর্তনের দিকে আলোকপাত করেছেন। প্রথমত, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাবের নতুন নতুন কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সরকারের হাত থেকে ক্ষমতার উল্লেখযোগ্য অংশ শক্তিশালী ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তির কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা যন্ত্রের কাছে স্থানান্তরিত হচ্ছে। গুতেরেসের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমন সময়ের স্বার্থ ও বাস্তবতাকে ধারণ করছে, যে সময় অনেক আগেই গত হয়েছে। তাই প্রতিদ্বন্দ্বী জোটে বিভক্ত না হয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তিতে বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব গড়ার আহ্বান জানান তিনি।

মহাসচিবের মতে, বড় শক্তিগুলোর উপলব্ধি করা উচিত যে তাদের ক্ষমতা সর্বময় নয়। সামরিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগত শক্তি দিয়ে আজকের জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তিনি যুদ্ধ ও শান্তি, বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভবিষ্যতের চারটি বড় পরীক্ষা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন, সুদান ও মিয়ানমারের সংঘাতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে শক্তি কূটনীতিকে ছাপিয়ে যায় এবং জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে। তথাকথিত যুদ্ধবিরতি অনেক সময় প্রকৃত শান্তি আনে না, বরং সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত এর মূল্য দিতে হয়।

নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে গুতেরেস বলেন, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার কোনো স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকা অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্য। এছাড়া বৈষম্যকে কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে না দেখে ক্ষমতার প্রশ্ন হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি। বিপুল সম্পদ সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও কোটি কোটি মানুষ খাদ্য, পানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত থাকাকে তিনি বড় ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

নারীর সমতার বিষয়ে তিনি জানান, জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব ও সদর দপ্তরের পেশাদার পর্যায়ে পূর্ণ লিঙ্গসমতা অর্জিত হয়েছে। তার ভাষায়, সমতা কেবল স্বপ্ন নয়, এটি একটি সিদ্ধান্ত। জলবায়ু সংকটকে তিনি প্রজন্মের সবচেয়ে বড় ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা হিসেবে অভিহিত করে উন্নত দেশগুলোকে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে তথ্য ও প্রযুক্তির কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণে আনার সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দেন তিনি।

জাতিসংঘ সনদের তিন মূল ভিত্তি—শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করে গুতেরেস বলেন, মর্যাদা, সুযোগ ও অধিকার থেকে শান্তিকে আলাদা করা সম্ভব নয়। মহাসচিব হিসেবে তার মেয়াদের শেষ ১০০ দিনেও তিনি এই মূল্যবোধ রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ক্ষমতার আসল শক্তি অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং সবার জন্য একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করা। এই লক্ষ্য অর্জনে জাতিসংঘকে আরও শক্তিশালী ও দৃঢ় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জলবায়ু সংকটকে তিনি প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে গভীর ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা হিসেবে উল্লেখ করেন। ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্য অতিক্রমের আশঙ্কার কথা জানিয়ে উন্নত দেশগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমে সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জলবায়ু দূষণের জন্য দায়ীদের মূল্য পরিশোধের কথাও বলেন।

জাতিসংঘকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ, সমন্বিত ও মানুষের প্রয়োজনের সময় আরও বেশি উপস্থিত করার লক্ষ্যে ‘ভবিষ্যতের জন্য চুক্তি’ এবং জাতিসংঘের ৮০তম বর্ষের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin