মঞ্চের আলো ছাড়া অন্য এক জেমসকে যেমন দেখলেন সিডনিবাসী

Published: September 17, 2026, 6:47 am

সিডনির ব্যস্ত সড়কে মানুষের ভিড়ের মাঝে ফুটপাতের এক কোণে বেহালা বাজাচ্ছিলেন এক তরুণ পথশিল্পী। সেই সুরের টানে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় রক তারকা জেমস। সামনে কোনো মঞ্চ নেই, নেই হাজারো দর্শকের কোলাহল, তবুও জেমস অপলক দৃষ্টিতে ডুব দিলেন সেই অচেনা শিল্পীর সুরে। কোনো তাড়া বা পরিচয় দেওয়ার আগ্রহ ছাড়াই তিনি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে শুনলেন সেই সুরের মূর্ছনা। এই মুহূর্তটি যেন জেমসের সেই চিরন্তন বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটাল—সুরের কোনো সীমানা নেই।

এর মাত্র চার দিন আগে ১২ সেপ্টেম্বর রাতে সিডনির নরওয়েস্টের হিলসং কনভেনশন সেন্টারে জেমসকে দেখা গিয়েছিল ভিন্ন এক রূপে। সে রাতে গিটার হাতে মঞ্চ কাঁপিয়েছিলেন নগরবাউল, সঙ্গে ছিলেন কলকাতার ফসিলস ব্যান্ডের রূপম ইসলাম। হাজারো দর্শকের সামনে ‘দুষ্টু ছেলের দল’, ‘তারায় তারায়’, ‘ভিগি ভিগি’ কিংবা আবেগময় ‘মা’ গানের সুরে মাতোয়ারা ছিল পুরো অডিটোরিয়াম। তবে কনসার্টের সেই আলোঝলমলে পরিবেশের বাইরে জেমস ছিলেন একান্তই শান্ত, নিভৃতচারী এবং গভীর পর্যবেক্ষক।

সিডনিতে কনসার্টের পরবর্তী চার দিন তিনি কাটিয়েছেন সাধারণ একজন পর্যটকের মতো। বাণিজ্যিক এলাকার বিপণিবিতানে সহধর্মিণীর দেওয়া তালিকা ধরে কেনাকাটা করতে দেখা গেছে তাঁকে। কোনো বাড়তি নিরাপত্তা বা তারকাখ্যাতির আড়ম্বর ছাড়াই তিনি শহরের একটি পুরোনো অভিজাত দোকানে সুগন্ধি পরখ করেছেন দীর্ঘ সময় নিয়ে। বিক্রেতা বা আশপাশের ক্রেতারা হয়তো বুঝতেই পারেননি, তাদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন বাংলাদেশের রক সংগীতের অন্যতম প্রধান এক শিল্পী।

সঙ্গীতের বাইরে আলোকচিত্রের প্রতি জেমসের অনুরাগ দীর্ঘদিনের। সিডনি সফরের প্রতিটি বিকেলে ক্যামেরা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। কখনো বেঙ্গলি সিনে ক্লাবের তানিম মান্নান, প্রসেনজিৎ রায় ও সৈকত মণ্ডলের সঙ্গে, আবার কখনো দীর্ঘদিনের সঙ্গী আহসান এলাহী ফান্টি, গিটারিস্ট তালুকদার সাব্বির, ইশমামুল ফরহাদ, কিবোর্ডিস্ট আবদুল কাইয়ুম ও ব্যবস্থাপক রুবাইয়াত ঠাকুরের সঙ্গে তিনি বেরিয়ে পড়তেন ক্যামেরা হাতে। কখনো হারবারের তীরে কিরিবিলি, আবার কখনো অপেরা হাউস চত্বরে ট্রাইপড বসিয়ে তিনি তুলেছেন গোধূলির আলোয় হারবার ব্রিজ ও অপেরা হাউসের ছবি।

কিরিবিলির ঘাটে এক মজার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন জেমস। ছবি তোলার জন্য এক পথচারীকে অনুরোধ করলে তিনি জেমসকে মডেলের মতো পোজ দেওয়ার নির্দেশ দিতে শুরু করেন। সঙ্গীরা কিছুটা অস্বস্তিতে পড়লেও জেমস ছিলেন সম্পূর্ণ নির্ভার। তিনি হাসিমুখে সেই আলোকচিত্রীর প্রতিটি নির্দেশ মেনে পোজ দিয়েছেন, যা তাঁর সহজ ও প্রাণখোলা ব্যক্তিত্বেরই পরিচয় দেয়।

গাড়িতে ভ্রমণের সময় ফরাসি জ্যাজ শুনে সময় কাটানো জেমস আড্ডায় ঢাকার রিকশায় ঘোরার আনন্দের কথাও স্মরণ করেছেন। সিডনির কনসার্ট নিয়ে তিনি বলেন, ‘তোমাদের এই আয়োজনের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, তোমরা পুরো বাংলাকে এক সুতোয় গেঁথেছ। বাংলাদেশ হোক, কলকাতা হোক কিংবা সিডনি ও আমেরিকা—বাঙালি যেখানেই থাকুক, তাদের আত্মিক টান একটাই, সেটা হলো আমার বাংলা।’

সবশেষে ১৬ সেপ্টেম্বর মেলবোর্নের উদ্দেশে সিডনি ছাড়েন জেমস। ১৯ সেপ্টেম্বর মেলবোর্নে পরবর্তী কনসার্ট শেষে তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে। সিডনির রাজপথে কয়েকটা দিন কাছ থেকে দেখা এই নিরহংকার জেমসকে তাঁর সঙ্গীরা মনে রাখবেন অনেক দিন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo