জন্মহার বাড়াতে এবার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জুটি মেলাচ্ছে সিঙ্গাপুর

Published: October 5, 2026, 7:24 am

সিঙ্গাপুরে জন্মহার নেমেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এই পরিস্থিতিতে সন্তান জন্মে উৎসাহ দিতে নানা আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি এবার অবিবাহিতদের জুটি মেলানোর অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। সরকারি কর্মীদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘ফার্স্টডেট’ নামে একটি বিশেষ ডেটিং প্ল্যাটফর্ম। এই প্ল্যাটফর্মের ম্যাচমেকিং প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হচ্ছে নোবেল পুরস্কারজয়ী এক গাণিতিক অ্যালগরিদম।

দেশটির প্রযুক্তিবিষয়ক সরকারি সংস্থা গভটেক সম্প্রতি পরীক্ষামূলকভাবে এই ‘ফার্স্টডেট’ প্ল্যাটফর্মটি চালু করেছে। আপাতত ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সি অবিবাহিত সরকারি কর্মীদের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হয়েছে, যার নিবন্ধনের সময়সীমা গত সোমবার শেষ হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা তাদের জাতীয় ডিজিটাল পরিচয় ব্যবহার করে এতে প্রবেশ করেন।

এরপর আগ্রহ, অভ্যাস ও মূল্যবোধ সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত প্রশ্নপত্র পূরণ করতে হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে একবারে কেবল একজন সম্ভাব্য সঙ্গীর সঙ্গে তাদের মিলিয়ে দেওয়া হয়। গভটেক জানিয়েছে, সরকারি কর্মীদের বাইরে সাধারণ নাগরিকদের জন্য এই সেবা সম্প্রসারণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

সিঙ্গাপুর সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে দেশটির দ্রুত কমতে থাকা জন্মহারের উদ্বেগজনক চিত্র। ২০২৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই নগররাষ্ট্রে ৩০ হাজারেরও কম শিশু জন্ম নিয়েছে। এতে দেশটির প্রজনন হার নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন ০ দশমিক ৮৭-এ। প্রায় ৬০ লাখ বাসিন্দার এই দেশটিতে জনসংখ্যা হ্রাস ও দ্রুত বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে উপপ্রধানমন্ত্রী গ্যান কিম ইয়ং সতর্ক করে বলেন, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৪০-এর দশকের শুরুর দিকে দেশটির নাগরিক জনসংখ্যা কমতে শুরু করতে পারে, যা বয়স্কদের দেখাশোনার জন্য কর্মীর সংকট তৈরি করবে।

শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে সিঙ্গাপুর বর্তমানে অভিবাসনের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। আগামী পাঁচ বছরে প্রতিবছর ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার নতুন নাগরিক নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে ৬২ লাখ মানুষের এই ছোট দেশটিতে অভিবাসন বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে বেশ স্পর্শকাতর। অন্যদিকে, সরকারি কর্মকর্তারা সন্তান নেওয়ার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করলেও অনেক সিঙ্গাপুরবাসী এখন সন্তানহীন জীবন বেছে নিচ্ছেন।

দুই আয়ের পরিবারে কম খরচে জীবনযাপন কিংবা পোষা প্রাণীর প্রতি মনোযোগ দেওয়াকে তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই সংকট মোকাবিলায় গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং পরিবারগুলোকে সহায়তায় নতুন কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করেন। এর মধ্যে জন্মের পর থেকে ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিটি শিশুর জন্য প্রায় ৭০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার বা ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার সমপরিমাণ আর্থিক সুবিধার ঘোষণাও রয়েছে।

সরকারি এই ডেটিং অ্যাপে কৌতূহল থেকে নিবন্ধন করেছেন ৩০ বছর বয়সি সরকারি কর্মকর্তা নূর আয়েশা। গত কয়েক বছর ধরে জীবনসঙ্গী খুঁজলেও কাজ বা শখের বাইরে পুরুষদের সঙ্গে তার তেমন পরিচয় হচ্ছিল না। টিন্ডার ও বাম্বলের মতো প্রচলিত ডেটিং অ্যাপগুলোকেও তার কাছে ‘ভয়াবহ’ মনে হয়েছে। নূর সন্তান নিতে আগ্রহী হলেও সিঙ্গাপুরে আবাসন ও শিশুর দেখাশোনার অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে চিন্তিত। তাছাড়া সন্তান পালনের দায়িত্ব সাধারণত নারীদের ওপরই বেশি পড়ে বলে ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি কিছুটা হতাশ।

অন্যদিকে, শিক্ষা খাতে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা জেমি এই প্ল্যাটফর্মে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেলেও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, এই উদ্যোগটি কিছুটা ‘বিব্রতকর’ এবং মনে হচ্ছে সরকার বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত চেষ্টা করছে। জেমি বলেন, মানুষের সামাজিক দক্ষতা কমে গেছে। কর্মস্থল থেকে ফেরার পর তিনি এতটাই ক্লান্ত থাকেন যে কোথাও যাওয়ার শক্তি পান না।

তাছাড়া প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যবহার ও গোপনীয়তা নিয়েও তার মনে প্রশ্ন রয়েছে। তবে ‘ফার্স্টডেট’ কর্তৃপক্ষের দাবি, ব্যবহারকারীর প্রোফাইল শুধু তার সম্ভাব্য সঙ্গী দেখতে পারবেন এবং দুজন সম্মত হলেই কেবল যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ করা হবে। আইনগত বাধ্যবাধকতা ছাড়া এই তথ্য কোনো তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে শেয়ার করা হবে না।

ভালোবাসা ও সম্পর্কের মতো ব্যক্তিগত বিষয়ে সিঙ্গাপুর সরকারের হস্তক্ষেপ অবশ্য নতুন কিছু নয়। ১৯৮৩ সালে দেশটির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ এক বক্তৃতায় উচ্চশিক্ষিত নারীদের দেরিতে বিয়ে করা ও কম সন্তান নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, যা দেশটিতে ‘গ্রেট ম্যারেজ ডিবেট’ নামে পরিচিতি পায়। পরের বছর লির সরকার ‘গ্র্যাজুয়েট মাদার্স স্কিম’ চালু করে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মায়েদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো।

একই সময়ে উচ্চশিক্ষিত অবিবাহিতদের পরিচয়ের সুযোগ তৈরি করতে ‘সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ইউনিট’ বা এসডিইউ গঠন করা হয়। পরে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করা অবিবাহিতদের জন্যও আলাদা সংস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল।

সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের গবেষক তান এরন সার জানান, অতীতে সরকারের ম্যাচমেকিং উদ্যোগগুলো খুব একটা কার্যকর বা ব্যয়সাশ্রয়ী ছিল না। তবে বর্তমান প্রজন্মের কর্মকর্তারাও প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘ফার্স্টডেট’-এর ভিত্তি হলো গেইল-শ্যাপলি অ্যালগরিদম। গণিতবিদ ডেভিড গেইল ও লয়েড শ্যাপলি ১৯৬২ সালে এটি তৈরি করেন। দুই পক্ষের পছন্দের ক্রম বিবেচনা করে এই অ্যালগরিদম জুটি নির্ধারণ করে। শ্যাপলি এই কাজের জন্য ২০১২ সালে অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার পান।

সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মনোবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক জিন লিউ বলেন, প্রচলিত ডেটিং অ্যাপগুলোর তুলনায় ‘ফার্স্টডেট’ ভিন্ন পদ্ধতিতে কাজ করে। সেখানে অসংখ্য প্রোফাইল স্ক্রোল করার বদলে একবারে একজন সম্ভাব্য সঙ্গী দেখানো হয়। তবে প্রশ্নপত্র দিয়ে দুজন মানুষের মনের মিল হবে কি না, তা অনুমান করা কঠিন। তাছাড়া প্ল্যাটফর্মে কতজন অংশ নিচ্ছেন, তার ওপরই এর সাফল্য নির্ভর করবে।

সিঙ্গাপুরের পিএইচডি গবেষক ও সাবেক স্ট্রেইটস টাইমস সাংবাদিক তেও কাই শিয়াং মনে করেন, পছন্দের তালিকায় ভালোবাসাকে নামিয়ে আনা সম্পর্ককে অতিরিক্ত হিসাব-নিকাশের বিষয়ে পরিণত করতে পারে। এতে জীবনসঙ্গী যেন একদিকে আর্থিক অংশীদার, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত সন্তানের সহ-অভিভাবক হয়ে ওঠেন। সিঙ্গাপুরের সরকারি আবাসন ব্যবস্থাও এই মানসিকতাকে আরও জোরালো করছে। দেশটিতে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ সরকারি আবাসনে থাকেন।

তবে অবিবাহিত ব্যক্তিরা একা সরকারি আবাসন কিনতে পারেন না; ৩৫ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত এ সুযোগ নেই। তেও প্রশ্ন তুলেছেন, ৩৬ বছর বা তার বেশি বয়সীদের এই উদ্যোগের বাইরে রাখা হলো কেন। তার মতে, ডেটিংয়ের বড় বাধা হলো খরচ—রাতে যাতায়াতের ব্যয় থেকে শুরু করে বাড়িভাড়া পর্যন্ত। এ কারণে অনেক অবিবাহিত মানুষ ৩০-এর দশকেও বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকেন।

জুটি মেলানোর ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরই অবশ্য প্রথম নয়। ২০২৪ সালে জাপানের টোকিও মহানগর সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটিং অ্যাপ ‘টোকিও এনমুসুবি’ চালু করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল সরকারও ‘সিউলটিং’ নামে বিভিন্ন স্থানে অবিবাহিতদের জন্য পরিকল্পিত ব্লাইন্ড ডেটের আয়োজন করে আসছে।

তবে সিঙ্গাপুরের এই নতুন উদ্যোগ নিয়ে নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। কেউ এটিকে সরকারি অর্থের অপচয় বলছেন, আবার কেউ ঠাট্টা করে বলছেন, এবার হয়তো ‘রাষ্ট্র নির্ধারিত জীবনসঙ্গী’ মিলবে বা জীবনসঙ্গী খোঁজাও চাকরির লক্ষ্যমাত্রার অংশ হয়ে যাবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh